• এমন ভোট-রঙ্গ দেখিনি তো আগে
    এই সময় | ০১ এপ্রিল ২০২৬
  • মায়ের বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে জলপাইগুড়িতে এসেছি। বহু বছর পরে নির্বাচনের সময়ে দেশে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও মিটিং-মিছিল হচ্ছে। দেওয়াল লিখন দেখতে দেখতে বাজার করতে যাচ্ছি। তবে এখনকার ভোট-চিত্রের সঙ্গে ৮০-৯০ দশকের মিল খুঁজে পাচ্ছি না।

    সেই সময়ে শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়িতে মাইকে হেঁকে প্রচার চলত। যে দলের একটু বেশি পয়সা, তারা অটোতে মাইক বেঁধে প্রচার করত। পাড়ার বেকার দাদারা লাঠি হাতে ভোটে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করতেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুট মার্চ ছিল না। আটা-সুজি সেদ্ধ করে আঠা বানিয়ে গাছে গাছে কাগজের পোস্টার লাগানো হতো। এখন দেখছি কর্পোরেট ধাঁচে হ্যাঙ্গার প্যান্ডেল দিয়ে জনসভা, রোড-শো হয়। তখন কোথায় এ সব!

    ছাত্র রাজনীতি যখন উত্তপ্ত, সেই সময়ে আমি কলেজে পড়ি। সেটা ৮০-র দশক। জুলজি অনার্স নিয়ে শিলিগুড়ি কলেজে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। একদিন কলেজের দোতলায় উঠে দেখি, অধ্যক্ষর ঘরে ছাত্রনেতাদের ধুন্ধুমার বিক্ষোভ। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রিন্সিপালের টেবিল দোতলা থেকে সজোরে নীচে ফেলে দেওয়া হলো। এ সব দেখে জলপাইগুড়ি আনন্দচন্দ্র কলেজে ভর্তির আবেদন করলাম। রসায়নে অনার্স পেলাম। একদিন কলেজের গেটে তুমুল মারপিট। শুনলাম, এক সহপাঠীকে ছুরি মারা হয়েছে। সেখান থেকেও মন উঠে গেল।

    জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে ফিজিও অকুপেশন নিয়ে পিজি হাসপাতালে কোর্স করার সুযোগ পেলাম। সেখান থেকে মুম্বই, দিল্লি ঘুরে সোজা মার্কিন মুলুক। এখানে ভোটের অভিজ্ঞতা একেবারে আলাদা। মার্কিন দেশে কখন যে নির্বাচন আসে, আর কখন চলে যায়, ঠাহর করা যায় না।

    তিন দশক প্রবাসে আছি। ২০০৮-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাধিকার অর্জন করেছি। সে দেশে প্রত্যেকটি নির্বাচনে ভোট দিই। কিন্তু আমাদের দেশের মতো নির্বাচনের এক মাস ধরে এ রকম প্রস্তুতি-প্রচার, সেখানে একেবারেই নেই। ভোটের আগে মোবাইলে, মেলে প্রার্থীদের ম্যানিফেস্টো চলে আসে। সেগুলো পড়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। নির্বাচনের দিন রাস্তার দু'ধারে লাঠির আগায় প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে পুঁতে দেওয়া হয়। কোনও কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রয়োজন পড়ে না। সেনেট, হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ সদস্য এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাকে আমার পছন্দ, সেই প্রার্থীকে ভোট দিতে হয়। এর পাশাপাশি স্থানীয় কোনও নির্বাচন বাকি থাকলে, সেটাও একদিনে মিটিয়ে দেওয়া হয়।

    আমাদের দেশে যেমন এখন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন চালু হয়ে গিয়েছে। এ দেশে চালু ব্যালট পেপার। ছাপানো কাগজে সবার নামের উল্লেখ থাকে। যাকে পছন্দ সেখানে গোল করে দিতে হয়। বুথে থাকা একটি নির্দিষ্ট মেশিনে ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে দিলে একটি রিসিভ স্লিপ বেরিয়ে আসে। ব্যস শেষ।

    আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ। সেখানে নির্বাচন এমন রক্তপাতহীন, নির্বিঘ্ন করা যায় না?

    (অনুলিখন: সব্যসাচী ঘোষ)

  • Link to this news (এই সময়)