এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: সকালে সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে উঠে এসেছিল আশ্বাস বার্তা। বাংলায় ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ প্রায় ৬০ লক্ষাধিক ভোটারের নথির নিষ্পত্তি শেষ হবে আগামী মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিলের মধ্যে— সুপ্রিম কোর্টে বুধবার এমনই রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের তরফে। এই তালিকায় যাঁদের নাম বাদ পড়বে, তাঁরা যে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারবেন, সেটা আগেই জানিয়েছিল শীর্ষ আদালত। এ দিন বাংলার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে সিজেআই সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চ জানায়, দ্রুত এই ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করবে। বুধবার রাতের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের প্রশিক্ষণের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু সন্ধেয় সেই প্রশিক্ষণ শিবিরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণের মুখে পড়লেন কমিশনের আধিকারিকরা। এমনকী, কয়েকজন এক্স জাস্টিস প্রশিক্ষণ শিবির ছেড়ে বেরিয়েও যান। ফলে আজ, বৃহস্পতিবার থেকে ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করতে পারবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।
এ দিন সুপ্রিম শুনানিতে কমিশন জানায়, কলকাতার জোকায় কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন’ ভবনে ২১টি চেম্বার নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মতো ট্রাইব্যুনালের জন্য ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নামের বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দেয়, আবেদনকারীদের পর্যাপ্ত হিয়ারিংয়ের সুযোগ দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিধি ট্রাইব্যুনালই চূড়ান্ত করবে। সুপ্রিম কোর্ট এও জানায়, আবেদনকারীরা ইতিমধ্যে যে নথি জমা দিয়েছেন, সেগুলিকেই যেন বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল। তারপরে জমা দেওয়া কোনও নথিকে যেন মান্যতা দেওয়া না–হয়। নথির যথার্থতাই চূড়ান্ত ভাবে বিবেচিত হবে। আগামী ৬ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী শুনানি।এ দিন সন্ধেয় কলকাতা হাইকোর্টের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি ট্রাইব্যুনালের ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বসেছিলেন কমিশনের অফিসাররা। ছিলেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল–সহ অন্য সিনিয়র বিচারপতিরাও। সূত্রের খবর, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের একের পর এক প্রশ্নবাণে কার্যত দিশেহারা, নিরুত্তর হয়ে থাকেন কমিশনের অফিসাররা। এমনকী, বিরক্ত হয়ে ওই বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান একাধিক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। ভেস্তে যায় এ দিনের কর্মশালা।
সূত্রের দাবি, এ দিন বৈঠকের শুরুতে কমিশনের কয়েক জন অফিসার ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের একটি অ্যাপ দেখিয়ে জানান, সেখানেই সব অভিযোগ এবং নথি জমা রয়েছে। সেখান থেকেই নথি নিয়ে বিচার করতে হবে তাঁদের। বিচারপতিরা পাল্টা জানতে চান, এই কাজের জন্য গাইডলাইন বা এসওপি কোথায়? ইনফ্রাস্ট্রাকচার কী আছে? কোনও বিএলও কোনও ভোটারের নথি জমা নেননি, এই অভিযোগ করলেই কি তা বিচার্য হবে? অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের একাংশের যুক্তি, একজন ব্যক্তির নাম যখন ভোটার তালিকা থেকে চূড়ান্ত ভাবে বাদ দেওয়া হবে, তার আগে তাঁর বক্তব্য শোনার কেন সুযোগ থাকবে না? প্রত্যেক ভোটারকে তাঁর যুক্তি দেওয়ার সুযোগ থাকাও দরকার। হাইকোর্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের একের পর এক প্রশ্নবাণে দিশেহারা অফিসাররা এক সময়ে ফোন করেন কমিশনের অফিসে শীর্ষ কর্তাদেরও। কিন্তু তাঁরাও এ ব্যাপারে জবাব দিতে পারেননি। বেশ কয়েকজন বিচারপতি বুঝিয়ে দেন, কমিশন এই সব প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারলে ট্রাইব্যুনাল কাজ করবে না। অন্য বিচারপতিরা সহমত পোষণ করেন। সূত্রের খবর, এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন তোলেন, কমিশন কি আদৌ সমাধান করতে চাইছে কিছু? যদিও কোনও সদুত্তর না পেয়ে বিচারপতিরা ভার্চুয়াল বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান।
এর আগে এ দিন সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এখনও পর্যন্ত ৪৭ লক্ষ ৬০ হাজারের মতো ভোটারের নথির নিষ্পত্তি করে ফেলা হয়েছে। ফলে আগামী পাঁচ–ছ’দিনের মধ্যে বাকি নথির নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। এর মধ্যে কতজনের নথিতে বিচারকরা সন্তুষ্ট হতে পারেননি, তার কোনও পরিসংখ্যান আদালতে উঠে আসেনি। তবে কমিশন সূত্রের খবর, গড়ে ৪৫ শতাংশের মতো ভোটারের নথিতে বিচারকরা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। সার্বিক ভাবে এই হার বজায় থাকলে ২৭ লক্ষের মতো ভোটারের নাম সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে উঠবে না বলে ধরে নেওয়া যায়। তাঁরাই আবেদন করতে পারবেন ট্রাইব্যুনালে। তবে ভোটের আগে এঁদের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কি না অথবা এ বারের নির্বাচনে তাঁদের কি ভোটাধিকার থাকবে কি না— এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
শুনানি চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান বলেন, ‘আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, তার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তির হার (অ্যাজুডিকেশন লিস্ট) প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং বাদ পড়ার হার প্রায় ৪৫ শতাংশ— যা অত্যন্ত বেশি।’ যদিও এ দিন সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যদি কোনও ভোটার এ বারের নির্বাচনে ভোটদান করতে না পারেন, তার অর্থ এই নয় যে, সারা জীবনের জন্য তিনি ভোটাধিকার হারাচ্ছেন৷ এই মর্মেই বুধবার বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ, ‘মনে রাখতে হবে— যদি কেউ এই নির্বাচনে ভোট দিতে না-পারেন, তার মানে এই নয় যে, তাঁর ভোটাধিকার চিরতরে কেড়ে নেওয়া হবে৷’ আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে আইনজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, তার মানে যদি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের ট্রাইব্যুনাল সব আবেদনের নিষ্পত্তি ভোটের আগে সম্পন্ন করতে না–পারেন, তা হলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের এ বার ভোটাধিকার থাকবে না। কিন্তু তার মানেই যে তিনি চিরতরে বাদ গেলেন, তা–ও নয়। কমিশনের উদ্দেশে বিচারপতি বলেন, ‘আমরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট এক্সসারসাইজ় দেখছি। দু’টো স্তর আছে— একটা ভোটার তালিকা তৈরির পদ্ধতি, অন্যটি একজন ব্যক্তির মৌলিক ভোটাধিকারের বিষয়। মাথায় রাখতে হবে সংযোজন, বিয়োজন সব কিছুই যেন বৈধ হয়। বৈধ কোনও কারণ না দেখিয়ে একজন ব্যক্তির মৌলিক অধিকারকে আপনারা অস্বীকার করতে পারেন না। কেন একজন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে৷’
কমিশনের আইনজীবী ডি শেষাদ্রি নাইডু আদালতে জানান, ট্রাইব্যুনালের অফিসের জন্য যে ২১টি চেম্বার হচ্ছে, সেগুলি আট সপ্তাহের জন্য চাওয়া হয়েছে জলশক্তি মন্ত্রকের কাছে। অর্থাৎ, ‘বিচারাধীন’দের মধ্যে যাঁদের নথিতে জুডিশিয়াল অফিসাররা সন্তুষ্ট হতে পারেননি, তাঁদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাইব্যুনালের অন্তত আট সপ্তাহ লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে ভোট শেষ হয়ে যাবে। কলকাতা হাইকোর্টের তরফে শীর্ষ আদালতে পেশ করা রিপোর্টে ট্রাইব্যুনালের সদস্য ও জুডিশিয়াল অফিসারদের সাম্মানিক ও অন্যান্য খরচ ঠিকমতো দেওয়ার প্রসঙ্গও তোলা হয়। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে (সিইও) এ নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ দিনের শুনানি নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টে আজও কেস ছিল। আমি যতদূর শুনেছি ফার্স্ট ফেজে়র ইলেকশনের আগে সমস্ত প্রসেস কমপ্লিট করে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, যাঁরা অ্যাপিল করবেন, তাঁদের কথা শুনতে ট্রাইব্যুনালকে বলে দিয়েছে আদালত।’