• বড়বাজারের এক্সিট পোল ও ভোটে এগিয়ে ভুসো কালি, পিছিয়ে অন্য রং
    বর্তমান | ০২ এপ্রিল ২০২৬
  • সুকান্ত বসু, কলকাতা: ‘চোখে তে কাজল সে তো সবাই পরে...’ ক’জনা ভুসো কালির কথা জানতে পারে... কাউকে বেইজ্জত করতে ভুসো কালি মুখে মাখিয়ে ছেড়ে দেওয়া নিদান বাংলা সাহিত্যে অজস্র আছে। এ দু’টি কাজ ছাড়া তার খুব একটা কদর বাংলায় নেই। ফলে দৈনন্দিন জীবনে সর্বক্ষণ জড়িয়ে থেকেও বেচারা কালিটি চিরকালই অপাংক্তেয়। কিন্তু ভোট এলেই অন্য ছবি। তখন ভুসো কালির কদর যায় মারাত্মক বেড়ে। দেওয়ালে কালো রঙের বর্ডার দিতে হবে, ভুসো ছাড়া তো হবে না। নামের পাশে কালো দাগ কাটতে হবে, ভুসো কালি লাগবেই লাগবে। পতাকার ডান্ডা কালো-সাদা করতে হবে, ভুসো আনতে হল এক কৌটো। ফলে এসময় তার চাহিদা যায় হঠাৎ বেড়ে।

    কলকাতার বড়বাজারে রায়গঞ্জ, আমতা ও গাজল থেকে এসেছিলেন তিন খুচরো ব্যবসায়ী। তাঁরা পাঁচ কেজি করে ভুসো কালির অর্ডার দিলেন। পাইকারি বিক্রেতা প্রায় হাতজোড় করে বললেন, ‘দু’কেজি দিতে পারি। বাকিটা তিনদিন পর পাবেন।’ বছরভর অনাদরে থাকা ভুসো আচমকা হয়ে উঠেছে ভয়ানক দরকারি। ভোট আসে, যায়। কিন্তু কোনোবারই ম্লান হয় না তার কালো রং। এখন বহু দোকানে অন্যান্য পাঁচটা রঙের কৌটো থরে থরে সাজানো। বিক্রি হয়ে গিয়েছে বলে বাড়ন্ত শুধু ভুসো। 

    দোকানদাররা বললেন, ‘কলকারখানার চিমনি, প্রদীপ বা অন্য আগুনের ধোঁয়ার ঝুল থেকে তৈরি হয় ভুসো। প্রথমে পাতলা ফিনফিনে ঝুল সংগ্রহ করতে হয়। তা গুঁড়ো করলে মেলে কার্বনের মিহি ধুলো। তার রং মিশমিশে কালো। সেই ধুলোই হল কালো উৎকৃষ্ট রং। তার কালচে উপস্থিতি সৌন্দর্য বাড়ায় মানুষের চোখ থেকে শুরু করে ভোটের দেওয়ালের। ভুসো সংগ্রহ করে প্যাকেটজাত করা হয়। তারপর বিক্রি হয় বাজারে। বড়বাজার হল ভুসোর বড়ো মার্কেট। সেখান থেকে পাইকারি দামে কিনে রাজ্যের সর্বত্র খুচরো বিক্রি হয়। এখন এই কালিই চলে এসেছে অত্যাবশকীয় পণ্য রূপে।

    কথাপ্রসঙ্গে জেনে রাখা যায়, ‘ভুসো কালী’ নামে দেবী আছেন। তাঁর পুজোর ভিন রাজ্য থেকেও ভক্তরা কাতারে কাতারে আসেন বর্ধমানে।

    ফেরা যাক বড়বাজারে। পণ্ডিত পুরষোত্তম রায় স্ট্রিটের রং ব্যবসায়ী সমীরণ পাল। ফোন করে মহাজনকে ভুসো কালির মোটা বরাত দিলেন ভোটের কয়েক সপ্তাহ আগেই। বললেন, ‘আগে থেকে বেশি করে স্টক রাখতে হবে। না হলে খদ্দের ফিরে যাবে। এখন খুব চাহিদা।’ ব্যবসায়ী শঙ্কর সাউয়ের দোকানে এসেছিলেন পুরুলিয়ার নহিডা, হাওড়ার আমতা ও হাসনাবাদের তিন দোকানদার। স্টক কমে এসেছে বলে অর্ডার অনুযায়ী দিতে পারলেন না শঙ্করবাবু। মাত্র কয়েক কেজি দিয়ে বললেন পরের সপ্তাহে আবার আসতে। ভোটের আগে এতটাই চাহিদা ভুসো কালির। আমতা থেকে আসা রং ব্যবসায়ী সমর দাস বলেন, ‘এখনও গ্রাম বাংলাতে ভুসো কালি দিয়েই দেওয়াল লেখা হয়। এছাড়া বর্ডার ইত্যাদি কাজেও লাগে।’ 

    ভুসোর সঙ্গে সাবুর লেই, অ্যারারুট মিশিয়ে কালোর উজ্জ্বলতা বাড়াতে হয়। তারপর দেওয়ালে লাগালে রং খোলে বেশি। চকচক করে মিশমিশে ভুসোর কালো। বড়বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানালেন, ভোট শুধু নয়, প্রতিমা রং করার কাজেও ভুসো কালি লাগে। ফলে মৃৎশিল্পীরাও আসেন পাইকারি বাজারে। কালী পুজোর সময় চাহিদা খুব বেড়ে যায়।

    দিনকয়েক আগে এক তৃণমূল প্রার্থী বলেছিলেন, ‘ভোটের পর জিতে এসে ভুসো কালি মাখানো হবে ওদের।’ সে জন্যও কি বেশি করে ভুলো কালি মজুত করছেন দলের কর্মীরা? মুখ টিপে হেসে কৌতুক করলেন এক ব্যবসায়ী। বোঝা গেল, সবমিলিয়ে বেশ কেউকেটা হয়ে উঠেছে ভুসো। দেওয়াল থেকে মুখ সবকিছু খোলতাই করার কাজে নেমে পড়েছে।
  • Link to this news (বর্তমান)