• সৎ অফিসারদেরই শাস্তি দেয় সিস্টেম, দাবি করে ইস্তফা IAS রিঙ্কুর
    এই সময় | ০২ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: সিস্টেম সৎ ব্যক্তিদের এক অদ্ভুত শাস্তি দেয় — তাঁরা মাস–মাইনে পেয়ে যান ঠিকই, তবে অনেক দিন ধরে কোনও ভালো পোস্টিং বা কাজই দেওয়া হয় না। ফলে কাজ না করে স্যালারি নেওয়া দস্তুর হয়ে দাঁড়ায়। উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের বিশেষ ভাবে সক্ষম আইএএস অফিসার রিঙ্কু সিং রাহি এই অভিযোগ এনে তাঁর চাকরি থেকে পদত্যাগ করলেন মঙ্গলবার। কোনও রাখঢাক না করেই তিনি জানান, তাঁকে ‘অ্যাটাচড’ পদে রাখা হয়েছিল। মানে বসে বসে মাইনে পাচ্ছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ নেই। তাঁর কথায়, ‘পদত্যাগ আসলে নৈতিক সিদ্ধান্ত। কাজ না করে মাইনে নেওয়াটা দুর্নীতি।’ রিঙ্কুর কাজের ধরন বা পদত্যাগের যুক্তি নিয়ে অনেক আমলাই সহমত নন, কিন্তু তাঁদের একটা বড় অংশ মনে করছেন যে ‘সিস্টেম শাস্তি দেয়...’ — এ কথা অগ্রাহ্য করার উপায় নেই।

    ভোটমুখী বাংলায় জাতীয় নির্বাচন কমিশন এ বার অভূতপূর্ব ভাবে শীর্ষ স্তরের আমলা থেকে সর্বস্তরের সরকারি কর্মী ও পুলিশ আধিকারিকদের বদলিতে নজির গড়েছে। সেই আবহেই কমিশনের নির্দেশে বদলি হওয়া এক আইপিএস অফিসার ‘এই সময়’কে বলেছিলেন, ‘আমি এমন একজন যাঁকে সহজেই রিপ্লেস করা যায়। খুব সাধারণ মানের একজন অফিসার।’ তাঁর এই হতাশার কারণ লুকোননি। ২০২১–এর বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যেরই এক অতি স্পর্শকাতর এলাকায় বিনা রক্তপাতে ভোট করিয়ে যিনি সর্বস্তরে বাহবা কুড়িয়েছিলেন, তাঁর প্রশ্ন, ‘আমি কেন নির্বাচনের কাজ করতে যোগ্য নই?’ ওই অফিসারের কথার রেশ টেনে এক আইএএস অফিসারের বক্তব্য, ‘আমাদের উপরে অমানুষিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। কথা না শুনলেই গ্যারাজ পোস্টিং!’ সেই কথাই ২০২২–এর উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের অফিসার রিঙ্কুও বলেছেন। যেখানে কাজ নেই বা অত্যন্ত অ–গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং দেওয়া হয় যাতে মানুষের জন্য কাজ করতে না পারেন তাঁরা। রিঙ্কুর যুক্তি, ‘যাঁরা সিভিল সার্ভিসেস দিয়ে আমলা হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই চান মানুষের জন্য কাজ করতে। নিজের অর্থ বা বৈভব বাড়ানোর উদ্দেশে তাঁরা আসেননি, আসেন না। বেছে বেছে তাঁরাই সংশ্লিষ্ট সরকারের রোষের শিকার হন।’ তিনি জানান, সৎ অফিসারদের আত্মবিশ্বাস ও মর‍্যালিটি ভেঙে দেওয়ার জন্যই বছরের পর বছর এ সব চলে। কেউ মানতে বাধ্য হন, তাঁর মতো কেউ কেউ ছেড়েও দেন।

    রিঙ্কুর কথার সঙ্গে সহমত এই রাজ্যেরই এক পুলিশকর্তা। তিনি নিজেও এর শিকার। বললেন, ‘অনেক চাপ, প্রলোভনকে অগ্রাহ্য করে আমি আমার কাজে অবিচল থেকেছি। সে জন্য পোস্টিং খারাপ হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হচ্ছে। তাও কোথাও একটা মানসিক শান্তি থাকে — আমি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করিনি।’ তবে তিনি একটা টিপস–ও দিলেন তরুণ অফিসারদের উদ্দেশে। তাঁর বক্তব্য, ‘দেশের আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত। তাই যাঁরা সার্ভিসে আসছেন, তাঁদের কিছু বিষয়কে অগ্রাহ্য করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, সিস্টেম থেকে বেরিয়ে গেলে কি তা নিয়ে আর আন্দোলন তৈরি করা সম্ভব? ফলে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেই নিজের যোগ্যতা ও মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

    তবে রিঙ্কুকে নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।

    ২০২৫–এর ২৮ জুলাই, উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুর জেলার পুয়ায়ান মহকুমা শাসক (এসডিএম) হিসেবে যোগ দেন রিঙ্কু। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, আইনজীবীদের এক বিক্ষোভের সময়ো কান ধরে ওঠবোস করছেন তিনি। এই ঘটনার পরেই তাঁকে উত্তরপ্রদেশ রেভিনিউ বোর্ডে অ্যাটাচ করা হয়।

    জানা গিয়েছে, ঘটনাটি একটি তেহসিল পরিদর্শনের সময়ের। রিঙ্কু দেখেন, এক আইনজীবীর মুন্সি দেওয়ালের পাশে প্রস্রাব করছেন। এসডিএম হিসেবে তিনি ওই কর্মীকে সেখানেই ওঠবোস করতে বলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়। তাঁদের একাংশ রিঙ্কুকে জানান, তেহসিল চত্বরে শৌচালয়ের অবস্থা খুবই খারাপ। ঠিকঠাক ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়েই খোলা জায়গায় প্রস্রাব করতে হয় তাঁদের।

    তাঁদের অভিযোগ তিনি মেনে নেন এবং বলেন, তেহসিলের সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার হিসেবে এই খারাপ পরিস্থিতির নৈতিক দায়িত্ব তাঁরই। এরপর তিনি নিজেও সবার সামনে কান ধরে পাঁচ বার ওঠবোস করেন। সেই ভিডিয়ো–ই পরে ভাইরাল হয়ে যায়। ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে রাজ্য সরকার জেলাশাসকের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চায়। রিপোর্ট জমা পড়ার পরে তাঁকে এসডিএম পদ থেকে সরিয়ে রেভিনিউ বোর্ডে অ্যাটাচ করা হয়। সেখানেই তাঁর কোনও কাজ করার নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মাস কয়েক পরেই এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত।

    বাংলার এক জেলাশাসক বললেন, ‘এই ব্যবস্থায় ভ্যালু সিস্টেম বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। এমন কিছু সামাজিক বিষয় রয়েছে যা নিয়ে নীতিগত ভাবে বদল আনা প্রয়োজন, অথচ তা করার উপায় নেই!’ তিনি জানান, এর ফলে তাঁর নিজেকে দিনের শেষে একজন ‘ফেইলড অফিসার’ মনে হয়, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যান। তাও সে ভাবে কোনও রাস্তা খোলা নেই।

    আইএএসে যোগ দেওয়ার আগে রিঙ্কু ২০০৪–এ উত্তরপ্রদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা পাশ করে অফিসার হিসেবে কাজ করতেন। ২০০৮–এ জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিক হিসেবে কাজ করার সময়ে তিনি স্কলারশিপ ও পেনশন প্রকল্পে দুর্নীতি ফাঁস করেন। তার জেরে ২০০৯–এর মার্চে তাঁর উপরে হামলা হয়। সাত বার গুলি করা হয়, যার মধ্যে দু’টি গুলি লাগে মুখে। এই হামলায় তাঁর মুখ বিকৃত হয়ে যায়, একটি চোখের দৃষ্টি হারান এবং চোয়াল সরে যায়। প্রায় এক মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল তাঁকে। উত্তরপ্রদেশের হাথরসের বাসিন্দা রিঙ্কু। ২০২১–এ ‘প্রতিবন্ধী’ কোটায় ইউপিএসসি পাশ করে ২০২২–এ আইএএস অফিসার হন তিনি।

    ফলে রিঙ্কুর পদত্যাগ যেমন দেশের আমলা মহলে আলোড়ন ফেলেছে। এক প্রাক্তন আমলার প্রশ্ন, ‘শিরদাঁড়া বিক্রির জন্য ১০০ জনের মধ্যে ৯৫ জন মুখিয়ে আছেন। তাই বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয় রিঙ্কুর মতো অফিসারদের বা মেনে নিতে হয় সরকারের তুঘলকি কাণ্ডকারখানা।’ তাঁর খেদ, এমন শাঁখের করাত হয়েই ‘পাবলিক সার্ভিস’ করতে হয় ওই পাঁচ শতাংশ অফিসারকে। তার খোঁজ রাখে কে?

  • Link to this news (এই সময়)