• ‘এ বার কী হবে?’, বৃদ্ধাশ্রমে ডুকরে কাঁদছেন বিষ্ণুপদ
    এই সময় | ০২ এপ্রিল ২০২৬
  • বাবলু সাঁতরা, দাসপুর

    এত দিনের চেনা আশপাশটাকে বড্ড অচেনা ঠেকছে তাঁর। কোনও দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারছেন না। সব যেন কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখের জল মুছে ফের ডুকরে উঠছেন বছর ৮৫–র বৃদ্ধ, ‘এ বার কী হবে, বলুন তো?’

    নির্বাচন কমিশন ‘সার’ (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)–এর চুড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছিল ২৮ ফেব্রয়ারি। তখন বিবেচনাধীন ছিলেন প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটার। ধাপে ধাপে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করছে কমিশন। সেই তালিকা থেকেও বহু ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন নাম বাদ যাওয়া বহু ভোটার। দাসপুরের এক বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিক বিষ্ণুপদ রায় বলছেন, ‘আমি যে বৈধ ভোটার তা প্রমাণ করতে এখন কলকাতায় ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হতে হবে বলে শুনছি। কী ভাবে যে কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

    দাসপুরের ৩১৫ হাট সরবেড়িয়া বুথের বাসিন্দা বিষ্ণুপদ। খাতায়–কলমে বয়স ৮৫ বছর। কিন্তু, তাঁর দাবি ৯৩। গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে লেখাপড়া করেছেন। স্নাতকের পাঠ চুকিয়ে কলকাতার একটি প্রকাশনী সংস্থায় কাজও শুরু করেন। বিয়ে–থা করেননি। থাকতেন কলকাতার জোড়াবাগানে। সেখানে ভোটও দিয়েছেন। তারপরে অবসর নিয়ে গ্রামে ফেরেন। কিছু দিন পর থেকে পুরীর একটি আশ্রমে থাকতে শুরু করেন। সেখানে তাঁর বাক্স থেকে টাকা–পয়সা ও নথিপত্র চুরি যায়। ফের ফিরতে হয় গ্রামে।

    বেশ কিছুদিন ভবঘুরের মতো ঘুরে ২০০০ সাল থেকে দাসপুরের বৈকুণ্ঠপুর নিম্বার্ক মঠের বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে শুরু করেন। ২০০৬–এ ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করান। বৃদ্ধাশ্রম থেকেই গ্রামের বুথে ভোট দিতে যেতেন। বিষ্ণুপদ জানান, ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। বাবার জমি–জিরেত ছিল। যজমানিও করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পরে পরিস্থিতি বদলে যায়। লেখাপড়া ও কাজের তাগিদে কলকাতায় চলে যেতে হয়। তিনি বলছেন, ‘আমি এ দেশেরই বাসিন্দা। কত বার ভোট দিয়েছি। এখন সেই আমাকেই প্রমাণ করতে হবে, আমি বৈধ ভোটার! কী করব, বুঝতে পারছি না। আশ্রম ছাড়া তো আমার কেউ নেই।’

    স্থানীয় বিএলও (বুথ লেভেল অফিসার) কালীপদ পাল জানাচ্ছেন, ‘সার'-এর এনিউমারেশন ফর্ম পেয়ে তা জমাও দিয়েছিলেন বিষ্ণুপদ। নো-ম্যাপিং ভোটার হিসেবে শুনানিতে ডাক পড়ে। চূড়ান্ত তালিকায় তিনি ‘বিবেচনাধীন’ ছিলেন। আর এখন সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় তিনি ‘ডিলিটেড’। বিএলও–র কথায়, ‘আগেও ওই বৃদ্ধ বহু বার ভোট দিয়েছেন বলে শুনেছি। কিন্তু ওঁর নাম ২০০২–এর তালিকায় পাওয়া যায়নি। আশ্রম থেকে ফোনে আমাকে বলা হয়, তিনি নাকি ভেঙে পড়েছেন। আমি গিয়ে দেখা করে এসেছি। ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছি। না হলে নতুন করে ফর্ম-৬ পূরণ করে জমা দিতে হবে। কী করা যায়, দেখছি।’ বৃদ্ধাশ্রমের অধ্যক্ষ সুভাষ ত্রিপাঠী বলছেন, ‘আমাদের আশ্রমে থেকেও বেশ কয়েক বার ওই বৃদ্ধ ভোট দিয়েছেন। আমি গাড়ি ভাড়া করে দিতাম। তিনি ভোট দিতে যেতেন গ্রামের বুথে। নাম বাদ চলে যাওয়ায় তিনি খুব ভেঙে পড়েছেন। তবে বিএলও খুব সহযোগিতা করছেন। কিছু একটা সুরাহা নিশ্চয় হবে।’

  • Link to this news (এই সময়)