সোমনাথ মাইতি, তালসারি
প্রশ্নগুলো সহজ, তবে উত্তর এখনও পর্যন্ত অজানা...।
তবু বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছেন তালসারির স্থানীয় মানুষ। বুধবার সকাল সকাল তালসারি পৌঁছে স্থানীয়দের সঙ্গে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে উঠে এল ক্ষোভের কথা। তালসারির স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নৌকা চালকদের আক্ষেপ, ‘ঘটনার সময়ে সেখানে না থাকা সত্ত্বেও পুলিশি জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে। দুর্ঘটনার পরে তালসারিতে আসা পর্যটকদের একটাই প্রশ্ন, কোন জায়গায় নায়ক নৌকো থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। উত্তর দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
তালসারির বাসিন্দা ভোলা গঙ্গাই বলেন, ‘মিথ্যে খবর ছড়ানো হচ্ছে। অপপ্রচারের জেরে পর্যটকের সংখ্যা কমে গিয়েছে তালসারিতে। নৌকোয় উঠতে ভয় পাচ্ছেন পর্যটকরা। পেটে টান পড়ছে আমাদের।’
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় রাহুলের তলিয়ে মৃত্যুর কারণ নিয়ে একাধিক তত্ত্ব উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, ঘটনার দিন ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে শুটিং ইউনিট ও সিরিয়াল প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। আর এই ভাবে দুর্ঘটনার ভুল ব্যাখ্যায় ক্ষোভ বাড়ছে তালসারির মানুষের। তাঁদের দাবি, সে দিন মোটেও প্যাকআপ হয়নি, নৌকো থেকেও পড়ে যাননি রাহুল। শুটিংয়ের নিরাপত্তার দিকে আঙুল তুলেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। দায়ী করছেন সৈকত সম্পর্কে অজ্ঞতাকেও।
সমুদ্রে নেমে শুটিং করতে গেলে অনুমতি নেওয়া ছাড়াও কয়েকটি নিয়ম মানার কথা। অভিনেতারা জলে নামার আগে স্থানীয়দের নামানো হয় শুটিং স্থলটির নিরাপত্তা খতিয়ে দেখার জন্য। কিন্তু সে দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এই সিরিয়ালের শুটিংয়ের আগে তেমন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সঙ্গে কোনও স্থানীয় অভিজ্ঞ মানুষকেও রাখা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা পুলিন বেহারা তালসারি বোট ইউনিয়নের সম্পাদক। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে নৌকা ও ট্রলারে কাজ করছেন। ঘটনার দিন এই পুলিনের নৌকো নিয়ে উদ্ধারে গিয়েছিলেন স্থানীয় নৌকোচালক ভগীরথ জানা। পুলিন বলেন, ‘স্থানীয় একটা হোটেলে সিরিয়ালের লোকজন ছিল। আমাদের ঘাট থেকে দেড়-দু’কিলোমিটার দূরে চরের মাঝে শুটিং হচ্ছিল। সকাল থেকে শুটিং শুরু হয়েছিল। আমরা ঘাট থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম ড্রোন উড়ছে। বিকেল পাঁচটা নাগাদ দুর্ঘটনা ঘটে। তখনও আকাশে ড্রোন ছিল। মানে মোটেও প্যাকআপ হয়নি। শুটিং চলাকালীনই দুর্ঘটনা ঘটেছে।’
বছর ২৭–এর ভগীরথ বলেন, ‘বলা হচ্ছে, নৌকোয় শুটিং চলছিল। কিন্তু তা ঠিক নয়। নায়ক–নায়িকা জলের মধ্যে নেমে শুটিং করছিলেন। নায়িকা শাড়ি পরেছিলেন। স্রোতের টানে শাড়ি জড়িয়ে গিয়ে তিনি তলিয়ে যেতে থাকেন। তিনি ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। নায়ক তাঁকে বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দেন। ওপরে ড্রোন উড়ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, শুটিংয়ের কোনও দৃশ্য। যখন দেখলাম, ইউনিটের লোকজন নায়ক–নায়িকাকে বাঁচাতে সমুদ্রে ঝাঁপ দিচ্ছে, তখন বুঝতে পারি, এটা শুটিং নয়। দুর্ঘটনার আঁচ পেয়ে আমরা নৌকো নিয়ে ছুটে যাই। নায়িকাকে উদ্ধার করে নৌকোর দড়ি হাতে ধরিয়ে দিই। তার পরেই নায়কের দিকে এগোই। কিন্তু উদ্ধারের আগেই তিনি তলিয়ে যান। বেশ খানিকক্ষণ বাদে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।’
প্রত্যক্ষদর্শী বিমল বেহারা বলেন, ‘উদ্ধারের পরে দেহে প্রাণ ছিল। শুটিং ইউনিটের লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে রাহুলের মৃত্যু হয়। আমি জানি না, কেন বলা হচ্ছে, নৌকো থেকে পড়ে মৃত্যু। এটা মিথ্যে। ওই দৃশ্যে নৌকোর কোনও ব্যবহারই ছিল না।’
কথায় কথায় প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে নিয়েই পৌঁছন গেল দুর্ঘটনাস্থলে। জোয়ারের জল নেমে যাওয়ার পরে সরু স্রোত পেরিয়ে বালির চর। সেখানে দাঁড়িয়ে বিমল বলে উঠলেন, ‘ওই যে ওখানে হচ্ছিল শুটিং।’ থমকে দাঁড়াতেই নরম বালিতে পা ঢুকে যেতে থাকল।একটু দাঁড়িয়ে থাকলেই বালির গর্তে আটকে যাচ্ছে পা। মনে হচ্ছে, জলের স্রোত যেন টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। স্থানীয় লোকজন জানালেন, ভাটার সময় ছাড়া চরের এই অংশে নৌকো নিয়ে আসা সম্ভব নয়। নায়ক–নায়িকাকে জলে নামতে বারণ করা হয়েছিল।’ সতর্ক করেও যে লাভ হয়নি, সে কথা জানিয়ে গাফিলতি নিয়ে সরব হয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের কথায়, ‘তালসারির অবস্থান সুবর্ণরেখা নদীর মোহনায় হওয়ায় এই সৈকতটি দিঘা–মন্দারমণির চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। এখানে স্নান করতে নামেন না কেউ। হয় নৌকোয় ওডিশার দিকে চলে যান অথবা সেখানেই নৌকোয় ঘুরে বেড়ান। তালসারিতে তীব্র স্রোতের টান থাকলেও সমুদ্র দিঘার মতো উত্তাল নয়, অনেকটাই শান্ত।’
অথচ সেই শান্ত সমুদ্রই হয়ে উঠল প্রাণঘাতী!