অর্ঘ্য বিশ্বাস, ময়নাগুড়ি
তিনটে নদী। একটা দীর্ঘ জঙ্গলপথ। এ সব বাধা তুচ্ছ গণতন্ত্রপ্রিয় জনতার কাছে। তাই ঝুঁকি নিয়ে ভোট দিতে আসেন পূর্ব ডোববাড়ির বাসিন্দারা। কিন্তু এই রাষ্ট্র তাঁদের কী দিল, আর একটা নির্বাচনের মুখে উঠে আসছে সেই প্রশ্ন।
পূূর্ব ডোববাড়ি গ্রামটি জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি ব্লকে। রামসাই গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে এর অবস্থান একেবারে উল্টো প্রান্তে। বানারহাট ব্লকের নাথুয়ার পাশে। এক সময়ে জলঢাকা, মূর্তি ও ডায়না নদী নৌকোয় পেরিয়ে এখানকার বাসিন্দারা ভোট দিতে আসতেন। সেই নদীপথে আর নৌকো চলে না। সেখানে এখন ঘন জঙ্গল আর দীর্ঘ ঘাসবন। জঙ্গল জুড়ে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। তবুও বন্যপ্রাণের আতঙ্ক জয় করে প্রতি বার ভোট দিতে রামসাইতে আসেন পূর্ব ডোববাড়ির ভোটাররা। এ বারও আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার ঘন জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে ভোট দিতে আসবেন ৭০ জনের মতো ভোটার। সূর্য ডোবার আগেই ভোট দিয়ে তাঁদের ফিরতে হবে। ভবানন্দ, রাজু, দীপক কিম্বা শৈলবালারা এ ভাবেই প্রতি বার আসেন–যান।
নদীর গতিপথ পরিবর্তন করেছে দু'–তিন দশক আগে। সে কারণে গ্রামটি এখন বিচ্ছিন্ন। প্রায় ৩০টি পরিবার এখানে বাস করে। শ'খানেক মানুষ। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু আজও উন্নয়নের ছোঁয়া এখানে সেভাবে পৌঁছয়নি। গ্রামে পানীয় জলের তীব্র সঙ্কট রয়েছে। পর্যাপ্ত পথবাতি নেই। গত সেপ্টেম্বরে হড়পা বানে গোটা গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই ক্ষত এখনও সারেনি। তবুও শুকমণি ওরাওঁদের মতো বাসিন্দারা আশা নিয়ে ভোট দেন। তিনি বলেন, 'বছরের অধিকাংশ সময়ে হাতি, বাইসন ও গন্ডারের সঙ্গেই আমাদের থাকতে হয়। বন দপ্তরের কাছ থেকে তেমন সাহায্য মেলে না। নদীর রাস্তা যদি আবার কেউ বদলে দিতে পারেন, তা হলে আর যাতায়াতের কষ্ট থাকবে না। আমাদের দুর্দিন ঘুচবে।'
নদীর মর্জি বদলে দেওয়া কি মানুষের সাধ্য! কিন্তু যেটা সাধ্যের মধ্যে, সেটাও কি হয়েছে? গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক স্কুলটি তিন দশক ধরে বন্ধ। পড়াশোনার জন্য শিশুদের নাথুয়ার স্কুলের উপরে ভরসা করতে হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই, এ ক্ষেত্রে ভরসা নাথুয়া। সরকারি কাজের জন্য সারা বছর নদী আর জঙ্গল পেরিয়ে রামসাই যেতে হয়। বর্ষার সময়ে অগম্য এ পথ। হেঁটে নদী পারাপার করতে না পারলে ধূপগুড়ি হয়ে অনেকটা ঘুরে যাতায়াত করতে হয়। প্রবীণ বাসিন্দা ভবানন্দ রায় বলেন, 'তিন দশকে কেবল আশ্বাসই মিলেছে। গ্রামটিকে ধূপগুড়ি কিংবা বানারহাট ব্লকের অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়নি।' রামসাই গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান বিশ্বজিৎ ওরাওঁ বলেন, 'পঞ্চায়েত থেকে সাহায্যের চেষ্টা করা হয়। তবে মৌজা পরিবর্তন করা জটিল বিষয়।'
তিন নদীর মাঝে সেতুর দাবি অনেক দিনের। কিন্তু দুই প্রান্তের বাঁধের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। তাই এখানে সেতু নির্মাণ প্রায় অসম্ভব। একটি স্থায়ী সেতু হলে রামসাই, ডোববাড়ি ছাড়াও বানারহাট ও গয়েরকাটার মানুষের অনেক সুবিধা হতো। সদ্য বদলি হয়ে যাওয়া ময়নাগুড়ির বিডিও প্রসেনজিৎ কুণ্ডু অসুবিধার কথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, 'সত্যিই খুব সমস্যার বিষয়। গ্রামবাসীকে নদী, জঙ্গল পেরিয়ে রামসাইয়ে আসতে হয়। সমাধানের লক্ষ্যে চেষ্টা চলছে।'