নবগ্রামে উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে বিজেপি ও কংগ্রেসকে আক্রমণ মমতার
দৈনিক স্টেটসম্যান | ০২ এপ্রিল ২০২৬
বুধবার সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, ‘এত সামাজিক প্রকল্প বিশ্বে আর কোথাও পাওয়া যাবে না।’ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রাস্তা, পানীয় জল থেকে শুরু করে একাধিক জনমুখী প্রকল্পের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, নবগ্রাম বিধানসভায় উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর কথায়, এই প্রকল্পগুলির সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ‘দিনহাটায় ৩০ হাজার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ভবানীপুরে ৪০ হাজার নাম বাদ দিয়েছে।’ এই প্রসঙ্গে বিজেপিকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘ভবানীপুরে উকুন বাছছে। তবু লড়ব, জিতবও।’ একই সঙ্গে তিনি আবারও জানান, ‘২৯৪টি কেন্দ্রেই আমি প্রার্থী’। অর্থাৎ রাজ্যের প্রতিটি আসনে লড়াইয়ের নেতৃত্ব তিনি নিজেই দিচ্ছেন। রাজ্যবাসীকে সামনে এই বার্তাই তুলে ধরেন তিনি।
যুব সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র ভাতা নয়, কর্মসংস্থানের দিকেও জোর দিচ্ছে রাজ্য সরকার। তাঁর বক্তব্য, ‘যুবসাথীদের আমরা শুধু সাহায্য করছি না, তাঁদের জীবিকার পথও তৈরি করছি।’ পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি হিন্দু, মুসলিম ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, ‘বাস্তবের সঙ্গে কোনও যোগ নেই। কৃত্রিমভাবে প্রচার চালানো হচ্ছে।’ একই সঙ্গে কংগ্রেসকেও একহাত নিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে একসঙ্গে যাওয়ার কথা বলেছিলাম, তখন সাড়া মেলেনি।’ তাঁর দাবি, বুথ স্তরে তৃণমূল কর্মীরাই মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন।
প্রসঙ্গত, মুর্শিদাবাদ জেলায় ঐতিহ্যগতভাবে কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি থাকলেও এবারের নির্বাচনে তারা এককভাবে লড়াই করছে। ইতিমধ্যেই বহু কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণা করেছে তারা। এই প্রেক্ষাপটে নবগ্রামের সভা থেকে বিজেপির পাশাপাশি কংগ্রেসকে আক্রমণ করা রাজনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজ্যের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
গঙ্গার ভাঙন প্রসঙ্গেও কেন্দ্রকে তীব্র নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, মুর্শিদাবাদ জেলার সবচেয়ে বড় সমস্যা গঙ্গার ভাঙন। আর ড্রেজিং না হওয়ায় বন্যার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, ফরাক্কার জল বাংলাদেশকে দেওয়ার সময় কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তি করে ৮০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই টাকা রাজ্য পায়নি। তিনি বলেন, ‘ফরাক্কায় ড্রেজিং করা হয় না বলেই বন্যা হয়। ভাগীরথীর প্লাবনে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।’ একই সঙ্গে দাবি করেন, কেন্দ্র কোনও কাজ না করলেও রাজ্য সরকার নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভাঙন রোধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভগবানপুর ব্লকে কিছুটা সাফল্য মিলেছে।
অন্যদিকে, বীরভূমের নানুরে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে অতীতের নানুর গণহত্যার ঘটনাও স্মরণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। নানুর বিধানসভার প্রার্থী বিধানচন্দ্র মাঝির সমর্থনে জনসভায় তিনি জানান, সেই সময় তিনি রেলমন্ত্রী ছিলেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি তখন রেলমন্ত্রী ছিলাম। আমি ছিলাম দিল্লিতে। আমার কাছে খবর এল, নানুরে ১১ জন তফসিলি ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি তখন ভাবলাম, আমাকে তো যেতে হবে। কী করে যাব? আমি দেখলাম, একমাত্র পথ হল আসানসোল কিংবা দুর্গাপুরে নেমে গাড়িতে বোলপুরে আসতে পারি। তারপর নানুর আসতে পারব। দুর্গাপুরে আগে রাজধানী এক্সপ্রেস থামত না। মন্ত্রী যেখানে নামে, সেখানেই স্টপেজ হয়। সেদিন থেকে দুর্গাপুরে রাজধানীর স্টপেজ হয়।’
তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, নবগ্রাম থেকে মুখ্যমন্ত্রীর এই আক্রমণাত্মক ভাষণ আসন্ন নির্বাচনের আগে তৃণমূলের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে দিল। উন্নয়ন ও জনসংযোগকে সামনে রেখেই তারা লড়াইয়ে নামতে চাইছে— এই বার্তাই তুলে ধরা হল সভামঞ্চ থেকে।