‘চূড়ান্ত ব্যর্থ রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন।’ SIR-এর কাজে নিযুক্ত বিচারকদের ১৫ ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনায় রাজ্যকে চরম ভর্ৎসনা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের। মালদার কালিয়াচকে সাত জুডিশিয়াল অফিসারকে ঘেরাওয়ের ঘটনায় ব্যাপক ক্ষুব্ধ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। বৃহস্পতিবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দায়ের করা মামলার শুনানিতে তিরস্কারের মুখে রাজ্য। ওই ঘটনায় কেন মুখ্যসচিব, ডিজিপি, জেলাশাসকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে না, তা জানতে চাইল শীর্ষ আদালত।
বৃহস্পতিবার সকালেই মালদায় SIR-এর কাজে যাওয়া সাত বিচারপতিকে ঘেরাওয়ের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। যদিও এই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল।কালিয়াচকের ঘটনাকে কর্তব্যে গাফিলতি বলে উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন, কেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা উচিত হবে না। কেন তাঁরা নিষ্ক্রিয় থাকলেন, তা-ও জানতে চেয়েছে শীর্ষ আদালত।
বিচারকদের ঘেরাও হয়ে থাকার ঘটনা ‘শোচনীয়’ বলে উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, জুডিশিয়াল অফিসারদের মনোবল ভেঙে দিতে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ওই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কালিয়াচকের ঘটনায় নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে CBI অথবা NIA-কে দিয়ে তদন্ত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানাতে পারে, সেই অনুমতি দিয়েছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ডিভিশন বেঞ্চ।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর পর্যবেক্ষণ, বিচারকদের আটকে রাখার ঘটনা সরাসরি SIR-এর কাজে বাধা দেওয়া। এটা একটা পরিকল্পিত আক্রমণ। ক্ষুব্ধ প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্তকে ভর্ৎসনা করে বলেন,‘আপনাদের ব্যর্থতায় এটা ঘটেছে। বুধবার রাত একটা পর্যন্ত আমি নিজে জেগে থেকে ঘটনা মনিটর করেছি। লজ্জাজনক ঘটনা এবং নিন্দনীয়। আপনারা সবাই রাজনৈতিক মতাদর্শের উপরে ভিত্তি করে আচরণ করছেন। এমন রাজনৈতিক মেরুকরণ গোটা দেশের কোথাও দেখিনি।’
সাত জুডিশিয়াল অফিসারকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে শীর্ষ আদালত আরও জানায়, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কেউ যেন বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে না পারে। আদালতের মতে, এই ঘটনা রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত গাফিলতির প্রমাণ। আদালত আরও জানায়, ঘটনাস্থলে জেলাশাসক বা পুলিশ সুপার কেউই পৌঁছননি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপে DGP ও স্বরাষ্ট্রসচিব সক্রিয় হন। রাত ১২টার পর জুডিশিয়াল অফিসাররা মুক্তি পান, তবে ফেরার সময়ে তাঁদের গাড়িতে পাথর ছোড়া ও লাঠি নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটে। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রাত ১১টা পর্যন্ত জেলাশাসক সেখানে ছিলেনই না। পাঁচ বছরের একটি শিশুকেও খাবার ও জল দেওয়া হয়নি।’ এখানেই শেষ নয়, রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল (AG)-এর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দুঃখজনক ভাবে, আপনার রাজ্যে সবাই রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেন। আপনি কি মনে করেন, আমরা জানি না, কারা এই দুষ্কৃতীরা ছিল? অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ দিন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘কমিশনকে প্রয়োজনীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।’ এ প্রসঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, জুডিশিয়াল অফিসারদের নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং তাঁদের বাসভবনেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে হবে। যদি কোনও আধিকারিক বা তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকে, তা দ্রুত মূল্যায়ন করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশ, যে কেন্দ্রীয় সংস্থার উপর এই ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তারা সরাসরি এই আদালতে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেবে।
কালিয়াচকের ঘটনার প্রেক্ষিতে মুখ্যসচিব, ডিজিপি, জেলা শাসক ও অন্যান্য পুলিশ আধিকারিকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং আগামী ৬ এপ্রিল তাঁদের অনলাইনে আদালতে হাজির থাকতে বলা হয়েছে।
তথ্য সহায়তা: অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অমিত চক্রবর্তী