নীলাঞ্জন দাস, রায়গঞ্জ
বাংলায় যে কোনও নির্বাচন মানেই সন্ত্রাস- এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে জনমানসে। এ দল-ও দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, বুথ দখল, বোমাবাজি, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে হুমকি- এমনকী, লাশ পড়ার ঘটনাও ঘটেছে বিগত নির্বাচনগুলিতে। তাতে আখেরে যে সাধারণ মানুষেরই ক্ষতি হয়েছে, তা যেন মানুষ বুঝেও বুঝছে না। এমনই আক্ষেপ রায়গঞ্জের এক ব্যবসায়ী উদয় দত্তের। তবু তিনি হতাশ হতে চান না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন তাঁর 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে লিখেছিলেন, 'মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।' উদয়ও তেমনই মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে নারাজ। আর তাই এ বার ভোটের মুখে নিজের দোকানে সচেতনতার বার্তা দিয়ে ব্যানার টাঙিয়েছেন তিনি। তাতে লেখা-'রক্ত নয়, শান্তি চাই।' এখানেই শেষ নয়। পতাকা টাঙানো নিয়ে যেখানে দলে-দলে মারপিট বেঁধে যায়, সেখানে নিজের দোকানে উদয় স্বয়ং প্রধান চারটি রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা লাগিয়ে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
রায়গঞ্জ শহরের বিবেকানন্দ মোড় এলাকায় রয়েছে উদয়ের দোকান। সেখানে গেলেই বড় বড় অক্ষরে 'রক্ত নয়, শান্তি চাই' লেখা ব্যানার চোখ এড়াবে না। সাধারণত দোকানের ব্যানার কিংবা সাইনবোর্ড ব্যবহার হয় কোনও প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনের জন্য। কিন্তু উদয় বরাবর ব্যতিক্রমী চিন্তার মানুষ। এই প্রথম নয়, এর আগেও তিনি নানা ঘটনায় বিশেষ বার্তা দিতে ব্যানার টাঙিয়েছেন। গত বছর মে-তে 'অপারেশন সিন্দুর'-এর পরে ভারতীয় কুর্নিশ জানিয়ে তিনি ব্যানার টাঙিয়েছিলেন। গত বছরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের উপরে ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক (ট্যারিফ) চাপিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পরেও নিজের দোকানে ব্যানার টাঙিয়েছিলেন উদয়। ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে ব্যানারে লিখেছিলেন, 'ডোন্ট ট্রাই টু ব্ল্যাকমেইল মি।' এখানে 'মি' অর্থাৎ ভারতবর্ষ। এ বারে তিনি ভোট-হিংসা বন্ধ করার বার্তা দিয়েছেন।
১৯৭৯ থেকে ওই এলাকায় ড্রাইফুডের ব্যবসা করে আসছেন উদয়। জীবনে অনেকগুলি নির্বাচন দেখেছেন। ভোট দিচ্ছেন বহুদিন ধরে। ভোট-হিংসার কারণে রক্তপাত, খুনোখুনি, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি দেখেছেন। এ বারে যাতে আর একটিও এমন ঘটনা না-ঘটে সেটাই চাইছেন ৬৪ বছরের এই ব্যবসায়ী। রায়গঞ্জের বীরনগর এলাকার বাসিন্দা উদয় বলছেন, 'ভোট গণতন্ত্রের উৎসব। এই উৎসব যেন শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন হয়, সেটাই চাই। রাজ্যে বিগত নির্বাচনগুলিতে যেভাবে সন্ত্রাস হয়েছে, তা কোনও ভাবেই কাম্য নয়। এ বছরও নানা জায়গায় অশান্তির খবর পাচ্ছি। এগুলো বন্ধ হোক। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও এ নিয়ে সচেতন হন। হিংসা কখনই কোনও সমাধান হতে পারে না। এই বার্তা দিতেই ব্যানার টাঙিয়েছি।'
তাঁর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন আশপাশের ব্যবসায়ীরাও। ওই এলাকার এক ব্যবসায়ী তুমার দত্ত বলেন, 'উনি (উদয়) বরাবরই এই ধরনের বার্তা দেন। নির্বাচনের আগে তাঁর এই বার্তা খুবই প্রাসঙ্গিক।' রায়গঞ্জ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অতনু বন্ধু লাহিড়ী বলেন, 'এক জন ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ভোট উৎসবে সামিল হতে পারে এটাই কাম্য।'