বাংলায় হাইভোল্টেজ বৃহস্পতিবারে তুঙ্গে নির্বাচনী সংঘাত। ভোটের প্রচার সভা থেকে কালিয়াচকের ঘটনায় সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে দায়ী করে গুরুতর অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘এর পিছনে অমিত শাহ আছেন, তাঁকে ক্ষমা করব না।’ পাল্টা তোপ দেগেছেন অমিত শাহও। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘দুর্নীতির রেকর্ড গড়েছে মমতার সরকার।
বুধবার SIR-এর কাজে মালদায় যাওয়া সাত বিচারককে প্রায় ১৫ ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখার ঘটনাকে ঘিরে উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় NIA অথবা CBI-কে দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রথমে সাগরদিঘির জনসভায় বক্তব্য রাখার সময়ে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণে উঠে আসে সেই ঘটনা। গোটা ঘটনাকে ‘বিজেপির চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেন তিনি। সুতির জনসভায় গিয়ে নেত্রীর দাবি, বুধবারের অশান্তিতে কংগ্রেসের যোগসূত্র থাকলেও পুরো ঘটনাই বিজেপির গেমপ্ল্যান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নামোল্লেখ করে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ‘অমিত শাহ চক্রান্তের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করছেন। আমি অনুরোধ করব, কেউ অশান্তিতে জড়াবেন না। এটা বিজেপির প্ল্যান। ওদের প্ররোচনায় পা দেবেন না।’
এ দিকে বৃহস্পতিবার সকালে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন জমা দেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর মনোনয়ন উপলক্ষে কলকাতায় এসেছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহ। মনোনয়ন পর্বের আগে হাজরার সভা থেকে সরাসরি তৃণমূল সুপ্রিমোকে হারানোর হুঁশিয়ারি দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শাহের কথায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর ঘরে ঢুকে হারানোর জন্যই শুভেন্দু অধিকারীকে এই কেন্দ্রে দাঁড় করানো হয়েছে।’
কালিয়াচকের ঘটনা নিয়ে শাহ অবশ্য এ দিন কোনও মন্তব্য করেননি। উল্টো দিকে, কালিয়াচকের ঘটনার জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতার অভিযোগ, ‘আমার হাতে এখন প্রশাসন নেই। আমার হাত থেকে সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। একদিকে হোম মিনিস্টার আর অন্য দিকে রাজ্যপালকে ডেকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন এখানে সুপার রাষ্ট্রপতি শাসন চালাচ্ছে। কমিশন হোম মিনিস্টার অমিত শাহের কথায় চলে। আমার কথায় চলে না।’
তবে এই ঘটনায় যে রাজ্যের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে, তা মেনে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মন্তব্য, ‘এ বার ওরা নির্বাচন বাতিলের চক্রান্ত করছে। একটা ঘটনা নিয়ে বলে দিচ্ছে সারা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা খারাপ।’ এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকেই আঙুল তুলেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, এ দিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্তকে কালিয়াচকের ঘটনায় ভর্ৎসনা করেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনাদের ব্যর্থতায় এটা ঘটেছে। বুধবার রাত একটা পর্যন্ত আমি নিজে জেগে থেকে ঘটনা মনিটর করেছি। লজ্জাজনক ঘটনা এবং নিন্দনীয়। আপনারা সবাই রাজনৈতিক মতাদর্শের উপরে ভিত্তি করে আচরণ করছেন। এমন রাজনৈতিক মেরুকরণ গোটা দেশের কোথাও দেখিনি।’
চক্রান্ত না করে সরাসরি ভোটের ময়দানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে এ দিন মমতা বলেন, ‘গায়ের জোরে মানুষের নাম কেটে অমিত শাহ ভাবছেন, ভোট করবেন। ক্ষমতা থাকলে সামনাসামনি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই করুন। খেলা হবে।’ মমতা যখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে এ কথা বলেছেন, তখন হাজরায় শুভেন্দুর সমর্থনে আয়োজিত প্রচারে উপস্থিত হয়ে শাহের মন্তব্য়, ‘ভবানীপুরে এই আসনে জিতিয়ে দিলেই গোটা বাংলায় পরিবর্তন আসবে। আমি শুভেন্দুদাকে বললাম, শুধু নন্দীগ্রাম নয়, মমতার ঘরে ঢুকে তাঁকে হারাতে হবে। আর ওঁর তো রেকর্ড আছেই। গত ভোটে মমতা পশ্চিমবঙ্গে সরকার তো গড়েছিলেন, কিন্তু নন্দীগ্রামে শুভেন্দুদার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। এ বার মমতা গোটা রাজ্যে তো হারবেনই, ভবানীপুরেও হারবেন। কারণ বাংলার মানুষ পরিবর্তন চাইছে।’
তবে এ দিন জনসভা থেকে রাজ্যবাসীকে সতর্ক করে জুডিশিয়াল অফিসারদের ঘিরে যে কোনও বিক্ষোভ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। এ দিন নেত্রীর মুখে বার বার শোনা গিয়েছে সেই সতর্কবাণী। তিনি বলেন, ‘মানছি,আপনাদের ক্ষোভ থাকতেই পারে। আন্দোলন করতেই পারেন, কিন্তু তা শান্তিপূর্ণ হতে হবে। বিচারকদের কাছে যাবেন না। দয়া করে বিচারকদের গায়ে হাত দেবেন না।’
মুখ্য়মন্ত্রী যখন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলছেন, তখন শাহের দাবি এ রকম: মমতার মুখ্যমন্ত্রিত্বে সারা রাজ্যে গুলি-বারুদের কারবার বেড়েছে, যুবকদের চাকরি নেই, মহিলাদের কোনও সুরক্ষা নেই। তাঁর কথায়, ‘দুর্নীতির রেকর্ড বানিয়েছেন মমতাজি, তাতে বিরক্ত গোটা বাংলার মানুষ। পুরো বাংলার মানুষ মমতাকে বিদায় দিতে তৈরি।’ ভবানীপুরের ভোটারদের কাছে এ দিন শুভেন্দু অধিকারীকে জেতানোর আর্জি জানান অমিত শাহ। অন্য় দিকে, বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার কালিয়াচকের ঘটনায় সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী করে বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাগাতার উস্কানির জন্যই এই ঘটনা। বাম আমলে অনিতা দেওয়ানকে যে ভাবে খুন করা হয়েছিল, এ ক্ষেত্রেও তেমনই অভিসন্ধি ছিল।’