• টোটালটাই করিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! মোথাবাড়ির অশান্তির ঘটনায় ক্ষুব্ধ মমতা
    এই সময় | ০৩ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: মালদার মোথাবাড়িতে সাতজন জুডিশিয়াল অফিসারকে বুধবার রাত পর্যন্ত বেনজির ভাবে আটকে রেখে বিক্ষোভের ঘটনায় সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে কাঠগড়ায় তুললে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, অমিত শাহের ইশারায় নির্বাচন কমিশন রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, জেলার পুলিশ সুপারকে বদল করার ফলেই জনতার ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের নথির নিষ্পত্তি নিয়ে এই অশান্তির নেপথ্যে কংগ্রেসেরও ইন্ধন রয়েছে বলে মমতা মনে করছেন। বস্তুত বৃহস্পতিবার তৃণমূলনেত্রী মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি, সুতি এবং মালদার বৈষ্ণবনগরের সভায় মোথাবাড়ির অশান্তির ঘটনা নিয়েই সরব হয়েছেন।

    সাগরদিঘির সভায় তিনি বলেন, ‘নতুন ডিজি, মুখ্যসচিব আপনারা করেছেন। নতুন এসপি আপনারা করেছেন। আইসি, বিডিও আপনারা ঠিক করছেন। তাঁরা জানবেন কী ভাবে কোথায় কী ভৌগোলিক চিত্র রয়েছে? কী জনবিন্যাস রয়েছে? টোটালটাই অমিত শাহ করিয়েছেন। টোটালটাই ইলেকশন কমিশনকে দিয়ে অমিত শাহের চক্রান্ত। তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি। অপদার্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী!’ বাংলার অফিসারদের নির্বাচন কমিশন কেরালা, তামিলনাড়ু–সহ একাধিক রাজ্যে পাঠিয়েছে। এই অফিসাররা যে ভাবে বিভিন্ন এলাকা সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তা সদ্য দায়িত্ব নেওয়া অফিসারদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় বলেও মমতার যুক্তি।

    মোথাবাড়ি বিধানসভার অন্তর্গত কালিয়াচক–২ বিডিও অফিসে ‘অ্যাজুডিকেশন’–এর নিষ্পত্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ঘিরে বুধবার দুপুর থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। বিক্ষুব্ধ জনতা জুডিশিয়াল অফিসারেদের মধ্যরাত পর্যন্ত ঘেরাও করে রাখে। রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করলেও সারাদিনের এই ঘটনাপ্রবাহ রাজ্যের বর্তমান মুখ্যসচিব (দুষ্মন্ত নারিয়ালা) তাঁকে জানাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতার কথায়, ‘(কমিশন নিযুক্ত) মুখ্যসচিব আমাকে একবারও ফোন করেননি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মুখ্যসচিব ব্যর্থ হয়েছেন। আমি রাত ১২টায় একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে জানতে পারলাম, বিচারকদের ঘেরাও করা হয়েছে। মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব কিংবা ডিজিপি— কেউ আমার সঙ্গে এখন যোগাযোগ করেন না। যেহেতু ওরা (কমিশন) আমার সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে, আইন–শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের হাতে নেই, তাই বাংলায় শান্তি বজায় রাখা এখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।’

    শাহি ইশারায় নির্বাচন কমিশন মুখ্যসচিব থেকে জেলার পুলিশ সুপারকে বদল করার ফলেই মোথাবাড়ির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করায় বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী নিজে বারবার মহিলাদের উস্কানি দিয়েছেন। তার ফলেই এই ঘটনা ঘটেছে। সাবিনা ইয়াসমিন কোন দলের? তাঁকে আপনি দল থেকে বহিষ্কার করতে পারবেন?’ বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, কালিয়াচক–২ বিডিও অফিস চত্বরে বুধবার সাবিনাও ছি‍লেন। শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদাররা তৃণমূলকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করলেও মমতার সাফ কথা, মোথাবাড়ির ঘটনার সঙ্গে তৃণমূলের কোনও সম্পর্ক নেই। পশ্চিমবঙ্গের বদ‍নাম করতে পরিকল্পিত ভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে মমতার অভিযোগ। দেশের সামনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হচ্ছে বলেও মমতার বক্তব্য।

    তৃণমূলের যুক্তি, নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে যেহেতু এখন সমগ্র পুলিশ–প্রশাসন রয়েছে, তাই মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করার কোনও জায়গা নেই। এ ছাড়া গেরুয়া শিবিরের পাশাপাশি কংগ্রেসের কিছু নেতাও ওই ঘটনায় ইন্ধন দিয়েছেন বলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন। মুর্শিদাবাদের দু’টি জনসভা সেরে মমতা মালদার বৈষ্ণবনগরের সভা করেন তিনি। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাকে ভোট দিন অথবা না–দিন কিছু যায় আসে না। যে মানুষ (মমতা) আপনাদের জন্য এত লড়াই করছে, তাঁকে অপমান করছেন কংগ্রেসের কথায়! বিজেপি টাকা দিচ্ছে। আমার দুঃখ হয়। আমি মর্মাহত। একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত বাংলাকে অপমানিত করল।’

    মমতা মোথাবাড়ির অশান্তির নেপথ্যে কংগ্রেসের হাত থাকার ইঙ্গিত করায় কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী বলেন, ‘হাজার হাজার বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাচ্ছে। তাঁরা প্রতিবাদ করবেন না তো কী করবেন? এঁদের কথা শোনার তো কেউ নেই। মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংঘাতের নাটক করছেন। ওঁর মোথাবাড়িতে যাওয়া উচিত ছিল।’ যদিও তৃণমূল নেতৃত্বের যুক্তি, বৈধ ভোটারদের নাম যাতে বাদ না যায়, সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন, কলকাতায় মেট্রো চ্যানেলে টানা ধর্নাতেও বসেছেন। মমতার এই প্রতিবাদের কারণে ‘অ্যাজুডিকেশন’ প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ নাম ইতিমধ্যে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে তৃণমূলের বক্তব্য।

    এই পরিস্থিতিতে কোনও প্ররোচনায় পা দিয়ে জুডিশিয়াল অফিসারদের ঘেরাও না করার, অশান্তি না করার জন্য বিক্ষুব্ধ জনতাকে আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈষ্ণবনগরে মমতা বলেন, ‘আপনারা দয়া করে কোনও পলিটিক্যাল পার্টির তরফে জজদের আক্রমণ করবেন না। কী দরকার ছিল, জজদের আটকে রাখার? যারা করেছে তাদের একজনকেও যেন ছাড়া না হয়। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে— এখন কতগুলো ছেলেকে সিবিআই, এনআইএ গ্রেপ্তার করে িনয়ে যাবে। যেটুকু ভোট দিতে পারতেনও তা–ও গেল।’ তৃণমূল নেতাদেরও মমতা নির্দেশ দিয়েছেন, কোনও ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে গেলে তাঁকে সব রকম সহায়তা করতে, কিন্তু জোড়াফুলের কোনও নেতা–কর্মী যেন জুডিশিয়াল অফিসারদের সামনে না যান। কোনও অশান্তি যাতে না হয় তার জন্যও সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন মমতা। সরাসরি আসাদউদ্দিন‍ ওয়েইসির দল এআইএমআইএম–এর নাম না–করে তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘হায়দরাবাদ থেকে কেউ একজন উড়ে এসেছেন। আপনাদের প্ররোচিত করার জন্য বিজেপি কিছু বিশ্বাসঘাতককে টাকা দিয়েছে। ওরা আপনাদের দিয়ে রাস্তা অবরোধ করিয়েছে এবং বিচারকদের ঘেরাও করিয়েছে। ফল কী হলো? এটা বিজেপির গেম প্ল্যান। ওরা নির্বাচন চায় না। ওরা রাষ্ট্রপতি শাসন চায়।’ মোথাবাড়ির ঘটনা নিয়ে রাজ্য সরকার ও কমিশন উভয়পক্ষের সমালোচনা করেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুজন চক্রবর্তী। তিনি বলেছেন, ‘বহু যোগ্য ভোটারের নাম খারিজ হয়েছে। মানুষের রাগ স্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য দুই তরফে অপরাধ করা হয়েছে।’

  • Link to this news (এই সময়)