এই সময়, নয়াদিল্লি: ‘কাউকেই নিজের হাতে আইন তুলে নিতে দেবো না’— বুধবার মধ্যরাত পর্যন্ত মালদার মোথাবাড়িতে ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের আটকে রেখে তাণ্ডব চালানোর ঘটনায় এমনই কড়া বার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চ বৃহস্পতিবার রাজ্য প্রশাসনের উদ্দেশে তীব্র ক্ষোভের সুরে বলেছে, ‘এই ঘটনা শুধু বিচারকদের ভয় দেখানোর চেষ্টা নয়, বরং এটি সর্বোচ্চ আদালতকেও চ্যালেঞ্জ করছে। এটি কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। মনে হচ্ছে, এটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যার লক্ষ্য ছিল বিচারকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং বাকি থাকা মামলাগুলির নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া। আমরা কাউকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বা বিচারকদের মনে ভয় তৈরি করে কাজে বাধা দিতে দেবো না।’ সিজেআই কান্তের ইঙ্গিতপূর্ণ সংযোজন, ‘এই ঘটনা ফৌজদারি অবমাননা হিসেবেও গণ্য হবে। এটা রাজ্য সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার উদাহরণ। দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের জানাতে হবে, কেন বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও তাঁরা বিচারকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেননি, রাজ্যের উচিত ছিল পুরো বিষয়টি কমিশনকে জানানো, যাতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা যায়। সে ক্ষেত্রে বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত। মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি এবং এসপি-র আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়।’ মুখ্যসচিব, ডিজিপি ও মালদার জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে শো–কজ় করেছে শীর্ষ আদালত। তাঁদের জানাতে হবে, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির চিঠির প্রেক্ষিতে কেন তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে না? আগামী সোমবার পশ্চিমবঙ্গের ‘সার’ সংক্রান্ত মামলাটি ফের শুনবে সুপ্রিম কোর্ট। ওই দিন শুনানিতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে হাজির থাকতে হবে এই চারজনকে। সুপ্রিম কোর্টের শুনানির পরে এ দিন জরুরি ভিত্তিতে ভার্চুয়াল বৈঠক করে নির্বাচন কমিশনের ফুলবেঞ্চ। সেখানে রাজ্য পুলিশ–প্রশাসনের কর্তাদের কঠোর বার্তা দেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার।
আইন–শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে?
তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এ দিনের শুনানিতে রাজ্যের সার্বিক আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েই বারবার প্রশ্ন উঠেছে। কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা অভিযোগ করেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে কোনও আইন–শৃঙ্খলা নেই৷ এই ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না৷’ নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডি শেষাদ্রি নাইডুর অভিযোগ, ‘যখন মবোক্র্যাসি হয়, তখন কিছু করার থাকে না৷’ বুধবার রাতভর যে তাণ্ডব চলেছে, তাতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের অবমাননা হয়েছে বলে মেনে নেন রাজ্যের কৌঁসুলি কপিল সিবালও। সিজেআইও মন্তব্য করেন, ‘রাজ্যের আইন–শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।’ যদিও সিবাল বেঞ্চের কাছে অনুরোধ করেন, ‘রাজ্যে আইন–শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে— এই লাইনটি (অর্ডার থেকে) বাদ দেওয়া হোক। এই মন্তব্যের গভীর প্রভাব পড়বে৷’ তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই সিজেআই কান্ত স্পষ্ট বলেন, ‘মিঃ সিবাল, গতকাল যা হয়েছে, সেই ঘটনা দেখার পরে এটা অস্বীকার করা যায় না৷’ বিচারপতি বাগচীর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘মিঃ সিবাল আপনি বক্তব্য রেখেছেন৷ আমরা শুনেছি৷’
রাত ২টো পর্যন্ত জেগে সিজেআই!
বুধবার রাতের ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলার ‘সার’ সংক্রান্ত মামলার জরুরি ভিত্তিতে শুনানি এ দিন স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে তালিকাভুক্ত করে সিজেআইয়ের বেঞ্চ। শুনানির শুরুতেই সিবালের কাছ থেকে সিজেআই কান্ত জানতে চান, মালদায় কী হয়েছে, তিনি আদৌ সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কি না। সিবাল বলেন, ‘যা হয়েছে, সেটা খুবই খারাপ৷ এটা আদালতের নির্দেশের অবমাননা৷ এই ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের৷’ রাজ্যের আর এক কৌঁসুলি মেনকা গুরুস্বামী যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন, ‘এটা অরাজনৈতিক ঘটনা৷’ তাঁর কথার মাঝেই প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিকেল থেকে জমায়েত শুরু হয়েছে। বিক্ষোভ হচ্ছে। মধ্যরাতে বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা ইস্যুটির রাজনীতিকরণ করতে চাই না৷ কোনও অতিরিক্ত মন্তব্যও করতে চাই না৷ এটা যদি অরাজনৈতিক প্রতিবাদ হয়, তা হলে রাজনৈতিক নেতারা কী করছিলেন? তাঁরা কেন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেননি? মধ্যরাত পর্যন্ত ঘেরাও চলেছে৷ প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ করেনি৷’ দীর্ঘক্ষণ বিচারকরা আটকে থাকার পরেও জেলা পুলিশ–প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে মালদায়। এমনকী, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপরে প্রথমে কোনও নির্দেশ না–থাকায়, তারাও হাত গুটিয়ে ছিল। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মারফত বিষয়টি পৌঁছয় সিজেআইয়ের কাছে। এ দিন শুনানিতে সিজেআই কান্ত রাজ্যের উদ্দেশে বলেন, ‘রাত ২টো পর্যন্ত জেগে থেকে সব কিছু মনিটর করতে হয়েছে আমাকে৷ অত্যন্ত কড়া নির্দেশ জারি করেছি আমি নিজে, তারপরে প্রশাসন পদক্ষেপ করেছে৷ পাঁচ বছরের শিশু সন্তানকে পর্যন্ত খাবার, জল দেওয়া হয়নি৷ মহিলাদের জোর করে আটকে রাখা হয়েছে৷ রাত ১১টা পর্যন্ত জেলাশাসক সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।’
পুলিশ–প্রশাসন ইসির অধীন?
এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না–হয়, সেজন্য বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে টপ মোস্ট অফিসারকে দায়িত্ব দিন। এই ঘটনায় সবার প্রতিবাদ করা উচিত। কমিশনকে প্রয়োজনীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।’ তখন গুরুস্বামী রাজ্যের সিনিয়র পুলিশকর্তা–আমলাদের কমিশন সম্প্রতি যে ভাবে বদলি করেছে, সেই প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর যুক্তি, ‘এই অফিসারদের নিয়োগ করেছে কমিশন৷ স্থানীয় আইপিএস, জেলাশাসক, বিডিও, ওসিদেরও বদলি করা হয়েছে৷ এখন রাজ্যের প্রশাসনের দায়িত্বে আছে নির্বাচন কমিশন৷’ রাজ্যের তরফে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেন, ‘প্রতিদিনই প্ররোচনা মূলক মন্তব্য করছে নির্বাচন কমিশন৷ ১৫ মার্চের পর থেকে রাজ্য প্রশাসনের সব কিছুর দখল নিয়েছে কমিশন৷ এই ঘটনা ঘটেছে নির্বাচন কমিশনের প্ররোচনার জন্য৷ আইন–শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার দায় নির্বাচন কমিশনের৷ তাদের বাছাই করা অফিসাররা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন৷’ মেহতার পাল্টা যুক্তি, ‘ভোটের আগে বদলি নতুন কোনও ঘটনা নয়৷’ নাইডু জানান, এই বদলির নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও দায়ের হয়েছিল। কিন্তু আদালত তা খারিজ করেছে। যদিও এই ঘটনার দায় কমিশনের না কমিশনের নয়, সেই বিতর্কে ঢুকতে রাজি হয়নি শীর্ষ কোর্ট। বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘যে অফিসাররা এখন দায়িত্বে আছেন, তাঁরা কেন নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন না৷ এই ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না কেউই৷ রাজ্যের শাসক–বিরোধী দল সবাইকে এই ঘটনার সমস্বরে প্রতিবাদ করতে হবে৷ সবাই মিলে জুডিশিয়াল অফিসারদের সুরক্ষা দিতে হবে৷ আমরা নির্বাচন কমিশনের উপরে ছাড়ছি বিষয়টি৷ তারা যেখান থেকে প্রয়োজন মনে করবে, কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগ করে নিরাপত্তা দেবে৷’
কেন পৌঁছয়নি প্রশাসন?
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি শীর্ষ আদালতে পাঠানো রিপোর্টে জানান, বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে বিক্ষোভ–অবরোধ চললেও বুধবার অনেক রাত পর্যন্ত জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার কেউই ঘটনাস্থলে পৌঁছননি। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকেই রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং স্বরাষ্ট্রসচিবকে ফোন করতে হয়। অবশেষে রাত ১২টা নাগাদ রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব এবং ডিজিপি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বাসভবনে পৌঁছন। সিনিয়র বিচারপতিরাও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাত ১২টার পরে পুলিশ–কেন্দ্রীয় বাহিনী গিয়ে কালিয়াচক–২ বিডিও অফিসে আটকে থাকা বিচারকদের মুক্ত করে। কিন্তু মধ্যরাতে মুক্ত হওয়ার পর যখন তাঁরা নিজেদের জায়গায় ফিরছিলেন, তখনও তাঁদের গাড়ির উপরে পাথর ছোড়া হয় এবং লাঠি, বাঁশ দিয়ে আক্রমণ করা হয়।’ সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার সওয়াল, ‘এই ঘটনার পরে কড়া বার্তা যাওয়া উচিত যে, নিরাপত্তার জন্য রাজ্যের উপরে নির্ভর করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’ সিজেআই বলেন, ‘কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আমাদের চিঠি লিখে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপে কোনও মেসেজ পাঠানো যায়নি৷’ বস্তুত পুলিশ–প্রশাসনের যে কর্তাদের কমিশনই দায়িত্ব দিয়েছিল, সেই প্রশাসনসিক কর্তাদের ভূমিকাতেই এ দিন চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত।
সবাই রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেন!
এ দিনের শুনানিতে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন, ‘জাতীয় নির্বাচন কমিশন এখানে প্রতিপক্ষের মতো ব্যবহার করছে৷ আমরা সবাই জানি, জুডিশিয়াল অফিসারদের নিরাপত্তা দিতে হবে৷’ তাঁর যুক্তি খারিজ করে প্রধান বিচারপতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনাদের রাজ্যে প্রত্যেকে রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেন৷ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা৷ আমরা কোনওদিন এমন মেরুকরণ–দুষ্ট রাজ্য দেখিনি৷’ সিজেআই কান্তের সংযোজন, ‘আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রেও রাজনীতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে৷ আপনি কী মনে করেন— আমরা জানি না, এই দুষ্কৃতীরা কারা? এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’
‘আপনাদের জন্য কেন প্রশ্নের মুখে আমরা’
এ দিন সুপ্রিম শুনানির পরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে ইসির ফুলবেঞ্চ জরুরি ভিত্তিতে রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনের কর্তাদের নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক করে। সূত্রের খবর, সেখানে ফুলবেঞ্চের প্রশ্নের মুখে পড়েন মালদা জেলাশাসক ও পুলিশ সুপার। সূত্রের খবর, সেখানে জ্ঞানেশ বলেন, ‘আপনাদের রেসপন্স করতে কেন এত দেরি হলো? অন্যান্য জায়গাতেও যদি এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটে দ্রুত রেসপন্স করতে হবে। আমাদের জন্য কেন কথা শুনতে হচ্ছে?’ ডিএম–এসপিকে সতর্ক করে জ্ঞানেশ বলেন, ‘আপনারা সতর্ক হয়ে যান। এ বারও যদি সতর্ক না হন, তা হলে কমিশন গোটা ব্যাপারটি দেখে নেবে।’ সূত্রের খবর, এসপি অনুপম সিংকে কার্যত ভর্ৎসনার সুরে জ্ঞানেশ বলেন, ‘আপনি এত বড় ঘটনার পরে ঘটনাস্থলে গেলেন না কেন?’ এসপি বলেন, ‘অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গিয়েছিলেন।’ জ্ঞানেশ তাঁকে পাল্টা বলেন, ‘তা হলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকেই এসপি–র দায়িত্ব দেওয়া হোক। আপনাকে ওঁর দায়িত্ব দেওয়া হোক।’ ফুলবেঞ্চের প্রশ্নের মুখে পড়েন ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কর্তারাও। সূত্রের দাবি, ডিজিপিকে উদ্দেশ করে ফুলবেঞ্চ বলে, ‘আপনারা যদি খবর পেয়ে থাকেন তা হলে আপনারাও তো রেসপন্ড করতে পারতেন।’ মূলত মালদা জেলার ঘটনার পরিস্থিতি নিয়েই প্রায় এক ঘণ্টা চলে বৈঠক। সেখানে সার্বিক আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়।