• অশান্তি করবেন বাতিল ভোটাররা, রিপোর্ট আগেই জমা পড়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে
    এই সময় | ০৩ এপ্রিল ২০২৬
  • সুনন্দ ঘোষ ও কৌশিক দে

    অগ্নিগর্ভ মালদার মোথাবাড়ি ও সুজাপুর। এতটাই যে, বুধবার রাত পর্যন্ত আটকে রাখা হলো বিচারকদের। অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ যাচ্ছে, তাঁদেরই বড় অংশ নামছেন রাস্তায়।

    ঘটনাটি ঘটেছে ১ এপ্রিল। যদিও তার কয়েকদিন আগেই এই অশনি সঙ্কেত পৌঁছেছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে। বলা হয়েছিল, ভোটের আগেই পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক গন্ডগোল হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে জমা পড়া ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, এই গন্ডগোলের নেপথ্যে রয়েছে বাদ যাওয়া ভোটারদের নাম। রিপোর্ট বলছে, যাঁদের নাম বাদ যাচ্ছে, তাঁদের সামনে রেখে ভোট বয়কটের ডাক, অন্যদের ভোটদানে বাধার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

    ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৬৩ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ গিয়েছে। অ্যাজুডিকেশনের নিষ্পত্তি হওয়ার পরে সেই সংখ্যা আরও অনেকটাই বাড়বে বলে আশঙ্কা। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ৫০ শতাংশও রাস্তায় নামলে সেই গোলমালের ব্যপ্তি বিশাল হতে পারে — মনে করছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তারা। গোয়েন্দাদের দাবি, নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় হু হু করে বাড়ছে সিটিজ়েনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা সিএএ–তে আবেদনের সংখ্যাও। পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ ইতিমধ্যেই ওই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে আবেদন করেছেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সূত্রের দাবি। সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা থেকে। মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেকেও এই আবেদন করছেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে জানানো হয়েছে।

    গোয়েন্দাদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ যাচ্ছে, তাঁরা নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন বলে মনে করছেন। তাঁদের অনেকেরই আশঙ্কা, নির্বাচনের পরে তাঁদের দেশ থেকে তাড়ানো হবে। প্রত্যন্ত এলাকায় কথা বলে গোয়েন্দারা জেনেছেন, অনেকেই অসমের মতো এখানেও ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ তৈরির আশঙ্কাও করছেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যতটা মরিয়া হয় মানুষ — গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী এঁরা ততটাই মরিয়া। যে কোনও সময়ে বড়সড় গোলমালের অংশ হয়ে উঠতে পারেন তাঁরা। শুধু মালদা নয়, ইতিমধ্যেই এ নিয়ে গোলমালের খবর আসতে শুরু করেছে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকা থেকে।

    স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে জমা পড়া রিপোর্ট জানিয়েছিল, গত প্রায় সাত দিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ধিকিধিকি জ্বলতে শুরু করেছে প্রতিবাদের আগুন। নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসবে, ততই এই ধরনের অশান্তি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের।

    এ বার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী আনা হচ্ছে — প্রায় ২৪০০ কোম্পানি। তা হলে এত দুশ্চিন্তার কারণ কী?

    স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক কর্তার দাবি, রামনবমীতেও তো কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল। তাতেও তো গোলমাল আটকানো যায়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কলকাতায় থাকাকালীন শহরের গিরীশ পার্কে দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সে দিনও কলকাতায় কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল। তাই, এ বার আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছে।

    এদিকে বুধবার রাতে মালদার মোথাবাড়ি এবং সুজাপুরে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরির পিছনে ‘বহিরাগত’–দের হাত রয়েছে বলে পুলিশ এবং গোয়েন্দা কর্তাদের দাবি। মোথাবাড়িতে সাত বিচারককে আটকে বিক্ষোভ দেখানোর অভিযোগে ওই কেন্দ্রের আইএসএফ প্রার্থী শাহজাহান আলি কাদেরীকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শাহজাহানের নাম আছে ভোটার তালিকায়। প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কেন সদলবলে ঘটনাস্থলে গেলেন? তাঁর বিরুদ্ধে মানুষকে উত্তেজিত করার অভিযোগ উঠেছে।

    ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে সুজাপুরে বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করা হয়। গভীর রাতে আচমকাই এক বহিরাগত সেখানে কড়া ভাষণ দিতে থাকেন। নদিয়ার ওই বাসিন্দা নিজেকে ‘আইনজীবী’ দাবি করে সুজাপুরের মানুষদের ‘সার’ নিয়ে বিভিন্ন পরামর্শও দেন। অতিরিক্ত জেলাশাসকের হাতে তাঁকেই ডেপুটেশন তুলে দিতে দেখা যায়। গোয়েন্দাদের প্রশ্ন, ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া সুজাপুরের কোনও নেতা কি ছিলেন না? কেন ‘বহিরাগত’–র সাহায্য নিতে হলো বিক্ষোভকারীদের। গোয়েন্দাদের দাবি, বহিরাগত কিছু মুখকে দেখা যাচ্ছে। যাঁরা নিজেরা বৈধ ভোটার। ‘সার’ ইস্যুতে তাঁরাই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন।

  • Link to this news (এই সময়)