অশীন বিশ্বাস, ঘোলা
স্ত্রীর নতুন পোস্টিং। তাই কাজের ফাঁকে একদিনের জন্য তাজপুরে গিয়েছিলেন চিকিৎসক দম্পতি। বৃহস্পতিবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাঁদের। ফিরলেনও, তবে শববাহী যানে! সমুদ্রে ডুবে মৃত উত্তর ২৪ পরগনার ঘোলার বাসিন্দা ওই চিকিৎসক দম্পতির নাম কুন্তল চক্রবর্তী (৩৬) ও শৈলজা ভরদ্বাজ (৩৫)।
পানিহাটি পুরসভার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বিবেকানন্দ পার্কের বাসিন্দা কুন্তলের সঙ্গে বিহারের পাটনার শৈলজার বিয়ে হয় ২০২৩–এর ফেব্রুয়ারিতে। কুন্তল পেশায় শল্য চিকিৎসক, শৈলজা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। কুন্তল বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর শৈলজা সদ্য মুর্শিদাবাদের ডোমকল মহকুমা হাসপাতালে 'সিনিয়র রেসিডেন্ট' পদে যোগ দিয়েছিলেন ('বন্ড সার্ভিস'। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সম্পূর্ণ করে রাজ্যের যে কোনও হাসপাতালে এক বছর সার্ভিস দেওয়ার সরকারি নিয়ম রয়েছে। তার জন্য প্রতি মাসে ভাতা দেওয়া হয়) সেখানে দিন চারেক ডিউটি করার পরে ছুটির দরখাস্ত দেন তিনি। ছুটি শেষে আজ, শুক্রবার তাঁর ফের জয়েন করার কথা ছিল। তার ফাঁকেই বুধবার দুপুরে একদিনের জন্য ওই দম্পতি তাঁদের ব্যক্তিগত গাড়িতে পুরোনো চালককে নিয়ে তাজপুরে গিয়েছিলেন। সন্ধে সাড়ে ৬টা নাগাদ তাজপুরে পৌঁছে বৃদ্ধা মা শঙ্করী চক্রবর্তীকে ফোন করে জানিয়েওছিলেন কুন্তল। দুঃসংবাদ পাওয়ার পরে বার বার সেই কথাই বলে চলেছেন বৃদ্ধা। বুধবার রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ বাড়িতে খবরটা আসার পর রওনা দেন পরিজন। এ দিন সকালে কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পরে পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়া হয়। রাতে পানিহাটি মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় ওই চিকিৎসক দম্পতির।
মন্দারমণি উপকূল থানা সূত্রের খবর, বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ তাজপুরে এসে পৌঁছন দুই চিকিৎসক। ড্রাইভারকে গাড়ি পার্ক করতে বলে দু'জনে সৈকতে নেমে যান। কুন্তলের গাড়িচালক জানিয়েছেন, পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে তিনি অপেক্ষা করছিলেন। ১০-১৫ মিনিট পরে দু'জনকে আর দেখতে পাননি। পরে স্থানীয়রা দেখেন, ওই চিকিৎসক দম্পতি জলে ভাসছেন। পুলিশ রাত সাড়ে আটটা নাগাদ দেহ উদ্ধার করে বালিসাই বড় রঙ্কুয়া হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দু'জনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন। ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। স্থানীয়দের কথায়, বুধবার পূর্ণিমার কোটাল ছিল। ফলে সমুদ্র ছিল উত্তাল।
পূর্ব মেদিনীপুরের কোস্টাল এলাকার দায়িত্বে থাকা ডিএসপি (ডিঅ্যান্ডটি) মোহিত মোল্লা বলেন, 'ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়। ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও অভিযোগ দায়ের হয়নি।'
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাবা বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর চাকরিসূত্রে কুন্তলের ছোটবেলা নাগাল্যান্ডে কেটেছে। পরে ঘোলায় মামাবাড়ির পাড়ায় চলে এসে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পরে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে শল্য বিভাগে স্নাতকোত্তর করেন কুন্তল। কোভিডকালে এমআর বাঙুর হাসপাতালে পোস্টিং ছিল তাঁর। পরে বেসরকারি হাসপাতালে যান।
অন্য দিকে, সম্প্রতি বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন শৈলজা। ডোমকল মহকুমা হাসপাতালে কাজে যোগ দেওয়ার পরে সেখানে বাড়িভাড়াও নিয়েছিলেন। দিন কয়েক আগে ছেলে-বৌমার সঙ্গে গিয়ে সেই বাড়ি দেখে এসেছিলেন বিশ্বজিৎ। এ দিন বিকেলে কুন্তলদের বাড়িতে এসে পৌঁছন শৈলজার পরিজনেরাও। কুন্তলের বৃদ্ধা মা পরিচিতদের দেখলেই প্রশ্ন করছেন, 'কেন এমনটা হলো?' উত্তর নেই কারও কাছেই!
(তথ্য সহায়তা: সোমনাথ মাইতি ও শুভাশিস সৈয়দ)