• লাইনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন নাম বাদ পড়া ভোটাররা
    বর্তমান | ০৩ এপ্রিল ২০২৬
  • পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: একদিকে ঢাকের বাদ্যি, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। অন্যদিকে, ফ্যাকাশে মুখে কয়েক হাজার মানুষের মনে জমাট বাঁধা আতঙ্ক। বৃহস্পতিবার সিউড়িতে জেলাশাসকের দপ্তর চত্বর এই বৈপরীত্যের সাক্ষী থাকল। একদিকে তৃণমূল-বিজেপি যুযুধান দুই শিবিরের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে উৎসবের মেজাজ। ঠিক তার কয়েক হাত দূরেই কয়েকশো অসহায় মানুষের সঙ্গী দীর্ঘশ্বাস আর চোখে জল। গণতন্ত্রের এই ‘উৎসবে’র বাদ্যির আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের আর্তনাদ। প্রত্যেকের একটাই প্রশ্ন, ‘নামটা কি ভোটার তালিকায় উঠবে?’ নাকি ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হবে দেশ ছেড়ে?

    ভোটের দামামা বাজার সঙ্গে ভোটার তালিকায় সংশোধনের ‘চক্করে’ বীরভূমের কয়েক হাজার বাসিন্দার নাম বাদ গিয়েছে। প্রশাসন সূত্রের খবর, এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার পর যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম ছিল ‘বিচারাধীন’। সেই তালিকার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, বহু মানুষের নাম মুছে গিয়েছে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট থেকে। এখন তাঁদের শেষ ভরসা ট্রাইবুনাল। সেই আবেদনপত্র জমা দিতেই সাতসকাল থেকে জেলাশাসকের দপ্তরে ভিড় জমাচ্ছে বহু মানুষ। রোদে পুড়ে, না খেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখের কোণে জল। 

    বৃহস্পতিবার সাতসকালে জেলাশাসকের দপ্তরে এসেছিল ময়ূরেশ্বর-১ ব্লকের বড়তুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিশিয়া গ্রামের বহু মানুষ। এই গ্রামেরই অন্তত ৩৬জনের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিশিয়া গ্রামের খাসিবুর মোল্লা বলছিলেন, ২০০২ সালের তালিকায় বাবার নাম ছিল। কিন্তু নামের বানান ভুল ছিল। যদিও বাবার নথি দিয়ে ম্যাপিং করে মা ও তিন বোনের নাম ভোটার তালিকায় উঠলেও আমার ও বাবার নামই বাদ পড়েছে। একই ছবি কোটাসুরের প্রজাপাড়াতেও। এদিন অশীতিপর বৃদ্ধা সাদেকা বিবি নথি আঁকড়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বহু বছর ধরে ভোট দিয়ে আসা মানুষটির নাম চূড়ান্ত তালিকায় ‘বিচারাধীন’ ছিল। সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশের পর তিনি জানতে পেরেছেন, তাঁর নাম ‘ডিলিট’ হয়ে গিয়েছে। ট্রাইবুনালে আবেদন তো করেছেন, কিন্তু আদৌ কি তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে আসবে? সাদেকা বিবির শূন্য দৃষ্টি যেন প্রশাসনের কাছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। ঠোঁট কাঁপছে অজানা আতঙ্কে। প্রশ্ন একটাই, এবার কি তবে ভিটেমাটি ছাড়তে হবে?  ভোটের নির্ঘণ্ট যত এগিয়ে আসছে, ততই তীব্র হচ্ছে এই হাহাকার। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম আর প্রশাসনিক জটিলতার জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া এই মানুষগুলোর কাছে ভোট এখন উৎসব নয়, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। জেলাশাসকের দপ্তরের বাইরে টেবিল-চেয়ারে বসে কর্মীরা ট্রাইবুনালের আবেদনপত্র গ্রহণ করছেন ঠিকই, কিন্তু তালিকায় নাম না ফিরলে কী হবে? ভয় আর অনিশ্চয়তার যে কালো মেঘ এই মানুষগুলোর মনে দানা বেঁধেছে, তা মেটানোর উত্তর আপাতত কারোর কাছে নেই। প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। উপরমহল থেকে যেমন নির্দেশ আসবে সেই অনুযায়ীই পদক্ষেপ করা হবে। নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)