কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: কলকাতার চীনেরা চমৎকার চাউমিন বানান, তা সবাই জানে। কিন্তু তাঁদের হাতের লেখাও খুব সুন্দর, এটা ক’জন জানে! ১৪৯ কসবা বিধানসভা আসনের তৃণমূল প্রার্থী জাভেদ আহমেদ খান না জানালে বোধহয় জানাই হত না।
বাইপাস কানেক্টরে পার্ক সার্কাসের দিকে যেতে তপসিয়া মোড়। সেখানে একটি দেওয়ালে জাভেদের সমর্থনে ‘চীনা’ ভাষায় লেখা হয়েছে বিশাল একটি দেওয়াল। চীন দেশে বহু প্রাচীন কিছু ভাষা আছে। তার অন্যতম। সেই লিপিতেই কলকাতার চীনে সম্প্রদায়ের তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা দেওয়ালে লিখেছেন, ‘ভোট দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জাভেদ আহমেদ খানকে জিতিয়ে আনুন।’ নানা রঙের ফ্লুরোসেন্ট কালারে লেখা দেওয়ালটি দেখতে হয়েছে চমৎকার।
জাভেদ খান ম্যান্ডারিন তেমন একটা জানেন বলে দাবি করেন না। তবে চীনে স্টিফেন লি, অ্যালবার্ট, মার্ক ওয়াং’দের দেওয়াল লিখতে দেখে বেশ উজ্জীবিত। বৃহস্পতিবার, এপ্রিলের খটখটে দুপুরে তাঁর সাদা পাঞ্জাবিতে ঘামের ছোপ, রোদে পুড়ে মুখ লাল। তবুও হাত লাগালেন দেওয়ালে। রং দিয়ে ভরাট করলেন ম্যান্ডারিন অক্ষর। আগেরবার বিধানসভা ভোটে এই আসন থেকে ৫০ হাজার ৬৫৩ ভোটে জিতেছিলেন তিনি। তারপর লোকসভা ভোটে এই বিধানসভা আসনে তৃণমূলের ভোট বেড়ে হয়েছিল ৫২ হাজার। ফলে এখন জাভেদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। রং বোলানোর ফাঁকে বললেন, ‘মার্জিন বাড়বে, অনেক বাড়বে। লিখে নিন।’
প্রিয় ‘খান সাবে’র এই একটি কথা শুনেই কর্মীরা ডবল উজ্জীবিত। ঘনঘন স্লোগান। তাতে গলা মিলছে সাধারণ ভোটারদেরও। কেউ এসেছেন পার্ক সার্কাস থেকে, কেউ আবার ঢাকুরিয়া। সবাই ‘খান সাবে’র ভোটার। আওয়াজ একটু স্থিমিত হওয়ার পর তাঁদেরই একজনকে জিজ্ঞেস করা হল, আচ্ছা এখানে বিজেপির প্রার্থী কেমন প্রচার করছেন? উত্তর যা এল, সেটা শুনে হতবাক হয়ে যেতে হয়। তাঁর সটান জবাব, ‘বিজেপি? তাদের আবার কে দাঁড়িয়েছে এখানে? ওসব কাউকে চিনি না। আমরা শুধু চিনি খান সাবকে।’ আর একজনকে একই প্রশ্ন। উত্তরও এক—‘বিজেপি-সিপিএম আবার কী? এখানে ওসব হয় না।’ জাভেদ খানের ঘনিষ্ঠ এক কর্মী পাশে দাঁড়িয়ে হাসছিলেন। বললেন, ‘ধর্তব্যের মধ্যে না এলে জাভেদদা একটা কথা বলেন, ব্যাটারি ডাউন। মানে ধরুন, বিরোধী কোনো প্রার্থী... কিন্তু এতটুকু দাগ কাটার ক্ষমতা তাঁর নেই। জাভেদদা তাঁকে বলবেন, ব্যাটারি ডাউন ক্যান্ডিডেট। কসবায় সবাই তেমনই ধরুন।’
মার্ক ওয়াং ভাঙা ভাঙা বাংলা বলেন। জানালেন, ‘৬৬ নম্বর ওয়ার্ডে আটশোর মতো চাইনিজ থাকেন। তৃণমূল সর্বদা তাঁদের পাশে। তাই তাঁরা জাভেদ খানকে ভালোবাসেন, রেসপেক্ট করেন। তাঁকেই ভোট দেন।’ আর জাভেদ খানের নিজের কথায়, ‘বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই এখানে আছেন। বাংলা সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে চলতে জানে। বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক নয় এখানকার মানুষ।’ একটু থামলেন। তারপর তাঁর সাফ কথা, ‘ইডিকে দিয়ে অনৈতিক কাজ করাচ্ছে বিজেপি। জেনে রাখুক, ওদেরকেও গদি ছাড়তে হবে। তারপর এই অস্ত্র কিন্তু ওদের বিরুদ্ধেই প্রযোগ হবে। সেই দিনটার জন্য তৈরি থাকুক বিজেপি নেতারা।’ তৃণমূলের ব্লক ৬৬ নম্বরের এগজিকিউটিভ কমিটির নেতা বিকাশ রায়, কার্তিক পাত্র এবং দেবাশিস ঘোষ দস্তিদারের বক্তব্য, ‘এবার তৃণমূলের ভোট অনেক বাড়বে। আগের মার্জিন ছাপিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’
চাউমিনের গন্ধে যাঁরা পায়ে পায়ে চায়না টাউনের দিকে ঢুকে যান, তাঁরা খেতে ঢোকার আগে তপসিয়া মোড়ে দাঁড়িয়ে বাঁদিকে চোখ ঘোরালেই দেখতে পাবেন, চীনে ভাষায় লেখা দেওয়াল লিখনটি উজ্জ্বল রং ছড়াচ্ছে। দেখতে হয়েছে কালারফুল, বিউটিফুল। দেখে বুঝতে না পারলেও আশপাশের হাওয়া-বাতাস আপনার কানে একটাই নাম ফিসফিস করে শুনিয়ে যাবে—জাভেদ খান।