• ‘কালো তো কী... হম দিলওয়ালে হ্যায়!’
    এই সময় | ০৩ এপ্রিল ২০২৬
  • সুমন ঘোষ, খড়্গপুর

    ছোটবেলায় পড়া ‘টকিং স্কাল’ গল্পটার কথা মনে আছে? গল্পের শেষে আগে থেকেই পড়ে থাকা একটি মাথার খুলি সদ্য ধড় থেকে ছিন্ন হয়ে যাওয়া শিকারির মুণ্ডুকে প্রশ্ন করেছিল, ‘হোয়াট ব্রট ইউ হিয়ার?’ শিকারির মুণ্ডু উত্তর দিয়েছিল, ‘টকিং ব্রট মি হিয়ার!’

    নাহ্‌, এ যুগে কথা বলার অপরাধে কারও শিরশ্ছেদ হয় না। তবে, ভোট-মরশুমে রাজনীতির কারবারিদের একাংশের কথা শুনে অনেকেরই লজ্জায় মাথা কাটা যায় বইকি! কিন্তু ওই নেতানেত্রীদের অবশ্য তা নিয়ে বিশেষ কিছু যায়-আসে না। বরং, কুকথার স্রোতে গা ভাসিয়ে তাঁদের অনুগামীরা বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন।

    খড়্গপুরে এ বারে বিজেপির প্রার্থী দিলীপ ঘোষ। ইতিমধ্যেই তাঁর বেশ কিছু কথাবার্তায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের তরফে অভিযোগ জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনেও। তবে, দিলীপ আছেন দিলীপেই, অর্থাৎ, ‘ছুটলে কথা থামায় কে!’ সম্প্রতি খড়্গপুরের তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকারের উদ্দেশে দিলীপেরই এক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বর্ণবিদ্বেষের’ অভিযোগও উঠেছে।

    আবার সেই মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রদীপ টেনে এনেছেন ১৯৬৫-তে মুক্তি পাওয়া ‘গুমনাম’ সিনেমার প্রসঙ্গ। আরও নিখুঁত ভাবে বললে, ওই সিনেমায় মহম্মদ রফির গাওয়া বিখ্যাত একটি গানের লাইন।

    ঘটনার সূত্রপাত খড়্গপুর পুরসভা এ‌লাকার পানীয় জলের সঙ্কট নিয়ে। গ্রীষ্মে পুরসভায় জল-সঙ্কট দেখা দেয়। কোথাও কোথাও কালো জলও বেরোয়। নির্বাচনী প্রচারে তা নিয়ে শাসকদল তৃণমূলকে কটাক্ষ করতে গিয়ে একটি পথসভায় দিলীপ বলে বসেন, ‘এখানে তো জলও মেলেনি। দু’দিন ছাড়া দল আসে। তা-ও আবার পরিস্রুত নয়, কালো জল। তৃণমূলের প্রার্থী ও চেয়ারম্যানের গায়ের রংয়ের মতো!’ এই মন্তব্য শুনে হাততালিতে ফেটে পড়েন তাঁর দলের কর্মী-সমর্থক ও অনুগামীরা।

    তাঁরা দিলীপের কথায় মজা পেলেও তৃণমূলও পাল্টা কটাক্ষ করতে ছাড়েনি। তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ বলেন, ‘এ ভাবে কাউকে ছোট করতে নেই। খড়্গপুরের মানুষ এই ধরনের আচরণ ও কথাবার্তা মেনে নেবেন না। দিলীপ ঘোষ ওঁর নিজস্ব রুচির পরিচয় দিয়েছেন। আমি শুধু রফি সাহেবের গান থেকে এটুকুই বলতে পারি— হম কালে হো তো কেয়া হুয়া দিলওয়ালে হ্যায়।’

    তৃণমূল শিবির এমন জবাবে বেশ খুশি। কর্মী-সমর্থকদের একাংশের কথায়, ‘কাদের রুচি কেমন তা এখান থেকেই তো স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা!’ খড়্গপুরের তৃণমূল প্রার্থী যে ‘দিলওয়ালে’ তা অবশ্য কবুল করে নিচ্ছেন অনেকেই। রাজনীতির আঙিনায় তাঁর বয়স খুব বেশি নয়। ২০১৯-এ খড়্গপুর (সদর) বিধানসভা উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে বিধায়ক। তার পরে ২০২২-এ খড়্গপুর পুর-নির্বাচনে জয়ী হয়ে চেয়ারম্যান।

    কিন্তু তার আগে প্রদীপকে খড়্গপুর চিনত অন্য ভাবে। খেলাধুলো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হঠাৎ কারও প্রয়োজনে রক্ত বা অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করে দেওয়া— কারও কোনও প্রয়োজনে মুশকিল আসান ছিলেন তিনিই। রাজনীতিতে আসার পরেও সে কাজ বজায় রয়েছে। ফলে দিলীপ ঘোষের এমন মন্তব্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা গিয়েছে কিছু এলাকায়।

    দেরিতে হলেও বিষয়টি বিলক্ষণ বুঝেছেন দিলীপও। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যাঁরা কালো ধান্দার সঙ্গে যুক্ত, কয়লা-বালি চুরি করেন, তাঁদের কালো বলব না তো কী বলব। গিয়ে দেখুন না মথুরাকাটি এলাকায়। কেমন কালো জল আসছে।’

    আর সেই কালো জলের কথা বলতে গিয়েই প্রার্থীর গায়ের রংয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনেন দিলীপ। যা নিয়ে খড়্গপুরে চলছে জোর চর্চা।

  • Link to this news (এই সময়)