• আড্ডায় বিরোধী-স্বর না–পসন্দ নেত্রীর, কালো প্লাস্টিকে ঢাকা পড়ল চায়ের দোকান
    এই সময় | ০৪ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: কী বলা যায় একে? তালিবানি শাসন?

    বাঙালির মজ্জায় আড্ডা। আর সেই আড্ডার অন্যতম পীঠস্থান চায়ের দোকান। সেখানে রাজনীতি থেকে খেলা, সিনেমা থেকে সামাজিক সমস্যা — উঠে আসে সবকিছুই।

    রাজ্যে দোরগোড়ায় বিধানসভা নির্বাচন। স্বাভাবিক নিয়মে এখন রাজনীতি নিয়ে আলোচনাই বেশি। সল্টলেকের ১৩ নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে আইএ মার্কেটের বাইরে চায়ের দোকান ঘিরে প্রতিদিনই বসে এরকম আড্ডা। সকালে এক দল এসে আড্ডা দিয়ে চলে যান। পরে আর এক দল এসে বসে। দুপুরে অন্য দল। এই দল বলতে মিশ্র পেশার লোক। কেউ ডাক্তার, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ অধ্যাপক, কেউ বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন, কেউ ইঞ্জিনিয়ার। কারও বয়স ৪৫ তো কারও বয়স ৭০। কেউ আইএ, কেউ এইচএ, কেউ এইচবি তো কেউ পূর্বাচলের বাসিন্দা। সেখানে কখনও রাজ্য সরকার তথা তৃণমূল দলের সমালোচনা হয়, কখনও তুলোধোনা করা হয় বিজেপি–র। উঠে আসে কংগ্রেস, সিপিএমের কথাও।

    সেটাই না–পসন্দ বিধাননগরের স্থানীয় ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলার মীনু দাস চক্রবর্তীর। অভিযোগ, তাঁর কাছে ‘রিপোর্ট’ পৌঁছেছে, ওই আড্ডায় মূলত বিরোধিতা করা হচ্ছে তৃণমূলের। এ নিয়ে এর আগে বহুবার তিনি নিজে এমনকী প্রতিনিধি মারফত সেই বার্তা পৌঁছে দিয়ে সতর্ক করেছেন, এমনটা ‘বাঞ্চনীয়’ নয়। তারপরেও ‘আড্ডাবাজ’ বাঙালিকে বাগে আনতে বিফল হয়েছেন তিনি।

    সম্প্রতি ওই আড্ডায় থাকা কয়েক জনের সঙ্গে সরাসরি তর্কে জড়িয়ে পড়েন কাউন্সিলার। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। যে চায়ের দোকান ঘিরে ওই আড্ডা, তার পাশেই থাকে খালি আর একটা দোকান। তার পাশের দোকান সকালে খালি থাকলেও সন্ধ্যার পরে সেখানে বসেন এক ফুচকা–বিক্রেতা। সকাল–দুপুরে সেই দোকানদু’টি ঘিরে বসে–দাঁড়িয়ে চলে আড্ডা। ক্ষিপ্ত কাউন্সিলার সেই খালি দোকানটি কালো প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। ফরমান জারি করেছেন — তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে প্লাস্টিক খোলা যাবে না।

    বিষয়টি উঠে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। সৌপর্ণ অধিকারী নামে এক ব্যক্তি দোকান–জুড়ে কালো প্লাস্টিকের ছবি–সহ ফেসবুকে লিখেছেন — ‘আইএ মার্কেট, সল্টলেকে চায়ের দোকানের পাশে সরকারবিরোধী আলোচনা হয়, লোকে নিজের মত প্রকাশ করে – এ জিনিস তৃণমূলের সইবে কেন? স্থানীয় পুরমাতা মিনু চক্কোত্তিরও সয়নি।’ পূর্বাচলের বাসিন্দা ৬৬ বছরের সন্দীপ ঘোষ অসুস্থতার কারণে নিয়মিত আসতে পারেন না আড্ডায়। তাঁর কথায়, ‘আমরা তো কোনও মানুষ বা দলের গুনগান বা নিন্দা করার জন্য আড্ডা দিতে যাই না। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যাই। সেখানে কথা প্রসঙ্গে নানা কথা চলে। এটা কারও গায়ে মাখা, তাঁর দৈনতা। আর সেটা নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা আখেরে তাঁর ক্ষতিই করে।’

    পেশায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘বাঙালির আড্ডা তো সংস্কৃতির অঙ্গ। সেটা বন্ধ করার প্রচেষ্টা তো প্রকারান্তরে সংস্কৃতির উপরেই আঘাত।’ আড্ডায় নিয়মিত আসেন চিকিৎসক অনিরুদ্ধ গঙ্গোপাধ্যায়। আহত কণ্ঠে বলেন, ‘এই পরিবর্তনের কথা ভেবে কি বাঙালি এই সরকারকে ক্ষমতায় এনেছিল? এত ইনসিকিউরিটি কেন?’ আড্ডায় থাকা প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘সমালোচনা করা যাবে না? এটা তো গণতন্ত্রের অঙ্গ। তা হলে কি ধরে নিতে হবে আমরা গণতন্ত্রটুকুও হারাতে বসেছি?’

    কী বলছেন কাউন্সিলার?

    প্রথমে ফোন করা হলে তাঁর যুক্তি, ‘ওখানে ২৪ ঘণ্টা বসে ওইসব আলোচনা হচ্ছে। বিজেপি–র লোকেরা বসে বসে মিটিং করছে। মানুষের অসুবিধে হচ্ছে। চায়ের দোকান ঢেকে দেবে না?’ পরে ফোনে বলেন, ‘ওটা চায়ের দোকান। সেটা সংশ্লিষ্ট দোকানদার বন্ধ করে রেখেছেন।’ মানতে চাননি, তিনি উদ্যোগ নিয়ে দোকানটিতে যাতে কেউ আড্ডা মারতে না পারে তার বন্দোবস্ত করেছেন। এই প্রসঙ্গে বিধাননগর পুরনিগমের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী বলেন, ‘স্বাধীন ভারতে মানুষ নিজের ভালোলাগা, খারাপলাগা, মতাদর্শ খোলাখুলি ভাবে প্রকাশ করতে পারে। তাতে কারও কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়।’

  • Link to this news (এই সময়)