এই সময়, জয়পুর ও বড়জোড়া: কথা দিয়েছিলেন বিজেপি সাংসদ। কেন্দ্রের টাকায় হাসপাতাল ভবনও তৈরি হয়। তার পরে কেটে গিয়েছে প্রায় দেড় দশক। আজও সেই হাসপাতাল চালু হয়নি পুরুলিয়ার জয়পুরে। শুক্রবার নির্বাচনী সভায় জয়পুরে এসে স্থানীয় এই ইস্যুকেই হাতিয়ার করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ দিন একই ভাবে বাঁকুড়ার পাত্রসায়রের সভায় গিয়ে কটাক্ষের সুরে বিরোধীদের বিঁধলেন অভিষেক। বললেন, ‘সোনামুখী ও ইন্দাসে ডাবল ইঞ্জিন সরকার চলছে। এখানে সাংসদ ও বিধায়ক দু’জনই বিজেপির। তা সত্ত্বেও কোনও উন্নয়ন হয়নি এলাকার।’
এ দিন পুরুলিয়ার জয়পুরে দলীয় প্রার্থী অর্জুন মাহাতোর সমর্থনে বামনিয়া ময়দানে সভায় অভিষেক বলেন, ‘এখানে প্রায় ৩০ হাজার পরিবার বিড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষত তাঁরা ঝালদা–২ ব্লকের বাসিন্দা।’ পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোকে নিশানা করে অভিষেক বলেন, ‘২০২৪–এর নির্বাচনের আগে বিড়ি শ্রমিকদের জন্য এখানে বিরাট মাপের হাসপাতাল তৈরির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বিজেপি সাংসদ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। এখন অন্য ব্লক থেকে সপ্তাহে এক দিন করে ডাক্তার আসেন।’
এর পরেই অভিষেক বলেন, ‘আগামী দিনে এখানে আমাদের সরকার হাসপাতাল তৈরি করবে। আমি কথা দিচ্ছি, অর্জুনকে জেতান। আমার নির্বাচনী এলাকা ডায়মন্ড হারবারের মতো জয়পুরকেও আমি আগলে রাখব। উন্নয়নে যাতে খামতি না–থাকে, অর্জুনের সঙ্গে কথা বলে সে কাজ আমি করে যাব।’
এই এলাকারই বাসিন্দা বিড়ি শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের যৌথ সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ভীম কুমার বলেন, ‘২০০৮–এ বাম আমলে এই হাসপাতাল গড়তে ঝালদার বাসিন্দা অনসূয়া দেবী আগরওয়াল জমি দান করেছিলেন। পরেকেন্দ্রের শ্রম দপ্তরের অর্থানুকূল্যে হাসপাতাল ভবন তৈরির কাজ শুরু হয়। সেই কাজ শেষ হয় ২০১২ নাগাদ। সে ভাবেই পড়েছিল ভবনটি। ২৪–এর লোকসভা ভোটের আগে রং সমেত বাকি কাজ শেষ হয়। কিন্তু হাসপাতাল চালু হয়নি।’
বিড়ি শ্রমিক সংগঠনের এই প্রবীণ নেতার দাবি, ‘বিড়ি শ্রমিকের সেসের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ কেন্দ্রের শ্রম দপ্তরের আওতাধীন শ্রমিক কল্যাণ বিভাগের কাছে জমা রয়েছে, সেই অর্থেই এই হাসপাতাল চালু হওয়ার কথা ছিল। বিড়ি শ্রমিকরা একাধইক বার আন্দোলন করলেও অবস্থা পাল্টায়নি। আগে যখন হাসপাতাল ছিল না তখন একজন চিকিৎসক জয়পুরে দু’দিন, ঝালদা–২ ব্লকে দু’দিন, আড়শায় একদিন, ঝালদা–১ ব্লকে দু’দিন— এ ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বসতেন। ব্লকগুলিতে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা পরিষেবা কেন্দ্র চালু ছিল।’ ভীম কুমারের অভিযোগ, ‘পর্যায়ক্রমে যে চিকিৎসক সব ব্লকে বসতেন সেই চিকিৎসককে তুলে এনে কেন্দ্রের হাসপাতালে বসিয়ে দেন বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। এটা হয় লোকসভা নির্বাচনের আগে। আর ভবনে রং করা হয়। এ ভাবে কি কোনও হাসপাতাল চালু হতে পারে?’
অসুস্থ থাকায় এ নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে পারেননি এলাকার বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক নরহরি মাহাতো। তবে বিজেপির পুরুলিয়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শঙ্কর মাহাতো বলেন, ‘প্রচারে এসে জেলার ব্লক স্তরে বা গ্রামে হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রগুলি কেমন অবস্থায় রয়েছে সে কথা তো একবারও মুখে উচ্চারণ করলেন না অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘চিকিৎসা না–পেয়ে মানুষকে ঝাড়খণ্ডে ছুটতে হয় কেন? কেন এই রাজ্যের মানুষের জন্য কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প আটকে রাখা হয়েছে?’ শঙ্কর বলেন, ‘অভিষেক আগে এই প্রশ্নগুলির জবাব দিক, তার পরে আমরা ওঁর প্রশ্নের জবাব দেবো।’
জয়পুর থেকে সভা সেরে এ দিন বেলা সাড়ে তিনটে নাগাদ পাত্রসায়রে পৌঁছন অভিষেক। ইন্দাসের প্রার্থী শ্যামলী রায় বাগদি, সোনামুখীর কল্লোল সাহা এবং ওন্দার সুব্রত দত্তর সমর্থনে পাত্রসায়রের গোরুর হাটে সভা করেন তিনি। ইন্দাসের বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক নির্মল ধাড়ার নাম করে কটাক্ষ করেন, ‘স্থানীয় বাসিন্দার কাছে বিজেপি বিধায়ক নিখোঁজ বিধায়ক নামেই পরিচিত। তাঁকে এলাকায় দেখা যায় না। কোনও উন্নয়নের কাজ তাঁর উদ্যোগে হয়নি। একটি স্টেডিয়াম করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ভোটের পরে ভুলে গিয়েছেন।’
ইন্দাসের প্রার্থীর প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, ‘শ্যামলীদেবী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে এলাকার আট হাজার মহিলাকে স্বাবলম্বী করেছেন। তৃণমূল সরকারের আমলে এখানে আকুই কমলাবালা মহিলা কলেজ, কিষান মান্ডি, কর্মতীর্থ হয়েছে। ভাগবতপুরে সেতুর অনুমোদন দিয়েছে রাজ্য সরকার। সোনামুখীর নফরডাঙায় ১৪ কোটি টাকা খরচে সেতু, ২০২৩–এ দমকল কেন্দ্র, ২০২২–এ আইটিআই তৈরি হয়েছে। তৃণমূল উন্নয়নে বিশ্বাসী আর বিজেপির অস্ত্র দাঙ্গা, অনাচার।’ অভিষেক আশ্বাস দেন, ‘সোনামুখী ও ইন্দাসের মাঝে একটি কোল্ড স্টোরেজ তৈরি করা হবে। শালি নদীর তীরে বাইপাস এবং সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের দাবি পূরণ করব আমরা।’