দুই ফুলে দুই বন্ধু, বাম-কংয়ের লক্ষ্য গড় ফেরানো! ভোট কাটাকুটির অঙ্ক কষছে বেলডাঙা
বর্তমান | ০৪ এপ্রিল ২০২৬
অভিষেক পাল, বহরমপুর: পিঠোপিঠি দুই বিধানসভা। একটা রেজিনগর। অন্যটি বেলডাঙা। এই ক’দিন আগে পর্যন্ত খাতায়-কলমে রবিউল আলম চৌধুরী ছিলেন রেজিনগরের বিধায়ক। কিন্তু, বেলডাঙার সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ। বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। বেলডাঙার অশান্তি থামাতেও রবিউলের সক্রিয় ভূমিকা দেখেছেন এলাকাবাসী। তিনিই এবার বেলডাঙার তুরুপের তাস।
রবিউলের দীর্ঘদিনের বন্ধু ভরত ঝাওর। একদা দু’জনে চুটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল করতেন। সেই সূত্রে বন্ধুত্বের গভীরতাও অনেক বেশি। তৃণমূলের দৌলতে পেয়েছিলেন পুরপ্রধানের কুর্সিও। পরে জার্সি বদল। এখন তিনি পুরোদস্তুর বিজেপি নেতা। তবে, রবিউল-ভরতের বন্ধুত্বে কোনও ছেদ পড়েনি আজও। মোদি-শাহরা সেই ভরতেই আস্থা রেখেছেন বেলডাঙা দখলে।
সালটা ১৯৫১। গঠিত হয় বেলডাঙা বিধনসভা কেন্দ্র। সেই থেকে এটি ছিল কংগ্রেসের গড়। বামেদের ভরা শাসনে সেই গড় তছনছ করে দেয় সিপিএমের শরিক আরএসপি। তারাও বেশ কয়েকবার আসন ধরে রাখে। ২০১১ সালে বেলডাঙা ছিনিয়ে নেয় কংগ্রেস। ২০১৬ সালেও কংগ্রেস থাকে বহাল তবিয়তে। কিন্তু, একুশের নির্বাচনে আর এঁটে উঠতে পারেনি তৃণমূলের সঙ্গে। এবার বেলডাঙায় বাম-কংগ্রেসের লক্ষ্য একটাই—গড়-গর্বের পুনরুদ্ধার। লক্ষ্যপূরণে বামেদের ভরসা রাজেশ ঘোষ। আর কংগ্রেসের শাহারুদ্দিন শেখ।
অতঃপর, মুর্শিদাবাদ জেলার এই বিধানসভা কেন্দ্রে এবার চতুর্মুখী লড়াই। অর্থাৎ, রবিউল বনাম ভরত বনাম রাজেশ বনাম শাহারুদ্দিন। এখানে লক্ষ্যণীয় তৃণমূল এবং কংগ্রেসের দু’জন প্রার্থীই হলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। ফলে, ভোটের সমীকরণ কোন দিকে ভাঙবে, আর কোন দিকে গড়বে, তার উপরই নির্ভর করছে বেলডাঙার ভাগ্য। তা নিয়েই এখন চর্চা পাড়ার মোড়ে, চায়ের ঠেকে, বাজারে কিংবা বাসে।
বড়ুয়া মোড় থেকে বেলডাঙা শহরে ঢোকার পথে দু’দিকে স্থায়ী, অস্থায়ী দোকানের সরি। ঠেলা গাড়ি লাগিয়ে ফল বিক্রি করছেন এক ব্যবসায়ী। সামনে জটলা। সেই জটলায় উন্নয়ন নিয়ে তরজা। রাখঢাক না করেই অনেককে বলতে শোনা যাচ্ছে, বেলডাঙার সার্বিক বিকাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অবদান কম নয়। তা ছাড়া সামাজিক সুরক্ষার একাধিক প্রকল্পে সব শ্রেণির মানুষের আর্থিক অবস্থাও বদলেছে। সে তুলনায় কেন্দ্রের মোদি সরকার কিছুই করেনি। উল্টে, একশোদিনের কাজের টাকা, আবাস যোজনার টাকা দিচ্ছে না। পাচরাহা রেল গেটের ধারে চপের দোকানে রুটিন আড্ডা বসে হিন্দু-মুসলিমদের। এদিন সেই আড্ডাতেও পাল্লা ভারি তৃণমূলের। কেউ কেউ কংগ্রেসের ভোট কাটাকুটির ভবিষ্যৎও ব্যাখ্যা করছেন। আবার অনেকে বাম ভোটের ঘর ওয়াপসি নিয়েও আলোচনা করছেন। দু’টি দল কার ভোট ব্যাঙ্কে কতখানি থাবা বসাবে, সেটা গরম চায়ের ধোঁয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন এক যুবক।
অঙ্কটা নিশ্চয় কষছেন রবিউল সাহেবও। বেলডাঙার মাটি তাঁর বড্ড চেনা। রাজনীতিক হিসেবেও বেশ পোড় খাওয়া। এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নষ্ট হলেই তিনি ছুটে আসেন। কড়া হাতে মোকাবিলা করেন। ফিরিয়ে আনেন শান্তি। বেলডাঙায় তাঁর এমন ভূমিকা প্লাসপয়েন্ট। তবে, এই একটামাত্র প্লাসপয়েন্টে তিনি ভরসা রাখছেন না। প্রতিনিয়ত বৈঠক করছেন দলের নেতাদের সঙ্গে। পরিকল্পনা করে প্রচারও। অন্যদিকে, রবিউল বন্ধু বলে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে নারাজ ভরত। বিজেপি প্রার্থী বলছিলেন, ‘রবিউল আমার বন্ধু তথা ভাইয়ের মত। এখন ওর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। আমি মুসলিম ও হিন্দু উভয়য়ের কাছে ভোট চাইছি।’ রবিউলও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রবিউলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো হলেও রাজনীতির লড়াইয়ে ছেড়ে কথা নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মান আমাকে রাখতেই হবে।’