বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: ‘‘আমাদের গেছে যে দিন/ একেবারেই কি গেছে—/ কিছুই কি নেই বাকি?’’ ... ‘‘রাতের সব তারাই/ আছে দিনের আলোর গভীরে!’’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অতিপরিচিত প্রেমের কবিতা ‘হঠাৎ দেখা’। উত্তর শহরতলিতে এই প্রেমের কবিতার কথা যেন ছত্রেছত্রে ফুটে উঠছে সিপিএমের নতুন প্রজন্মের মুখে মুখে। বসে যাওয়া, শিবির বদলানো সিপিএমের নেতা-কর্মীদের তীব্র আকুতি নিয়ে ফোন করছেন প্রার্থীরা। রাজ্য ও দেশের পরিস্থতি ব্যাখ্যা করে আগের মতো এবারের ভোটেও তাঁদের সক্রিয় হওয়ায় আহ্বান জানানো হচ্ছে। অবশ্য এনিয়ে কটাক্ষ শুরু করেছে বিরোধীরা। তৃণমূল বলছে, বিলম্বিত বোধোদয়। আর বিজেপির দাবি, সিপিএমকে ভোট দেওয়ার অর্থ তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখা।
উত্তর শহরতলি এবার বামেদের কাছে বড়ো রাজনৈতিক বাজি। দমদম লোকসভা এলাকায় সাত বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচ প্রার্থী যুব মুখ। তার মধ্যে বরানগরে সায়নদীপ মিত্র, পানিহাটিতে কলতান দাশগুপ্ত, খড়দহে দেবজ্যোতি দাস, উত্তর দমদমে দীপ্সিতা ধর এবং দক্ষিণ দমদমে ময়ূখ বিশ্বাস। পরপর কয়েকটি ভোটে এই শহরতলিতে তৃতীয় শক্তি বামেরা। তা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দমদমের সিপিএম প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী ২ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। শহরতলির কোনো কেন্দ্রে কাঙ্ক্ষিত জয় পেতে গেলে ওই ভোটকে যে কয়েকগুণ বাড়াতে হবে তা বিলক্ষণ বোঝেন পোড়খাওয়া বাম নেতারা। তাই বেশিরভাগ কেন্দ্রে নতুন ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নতুন মুখ দিয়ে শহরতলির শিক্ষিত ভোটারদের মন জয়ে মরিয়া বাম শিবির। নতুন প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি প্রচারের পাশাপাশি থিম সং, রিল ভিডিয়োসহ ‘ডিজিটাল ওয়ারে’ বিরোধী প্রার্থীদের রীতিমতো নাস্তানাবুদ করছেন। শুধু ডিজিটাল ওয়ার নয়, কঠিন লড়াই জিততে গেলে বুথেও জেতা জরুরি। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় বুথভিত্তিক দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন প্রার্থীরা। তাঁদের তালিকা বানিয়ে শিক্ষক, ডাক্তার, সাংস্কৃতিক কর্মী প্রভৃতিকে ফোন করা হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে প্রচারে ছিলেন খড়দহের সিপিএম প্রার্থী দেবজ্যোতি দাস। দুপুরে পানশিলা পার্টি অফিসে বসে দই খাচ্ছিলেন। সেই ফাঁকে তালিকা ধরে ধরে ফোন করছিলেন নিষ্ক্রিয় কর্মীদের। ফোনে বলছেন, নমস্কার আমি দেবজ্যোতি বলছি। ভোট চাইতে এই ফোন নয়। পরিচিত ব্যক্তিদের সামনে আপনার উপলব্ধি ও বিচার তুলে ধরুন। অন্যদেরও বলুন এইভাবে এগিয়ে যেতে। রাজ্যজুড়েই তৃণমূল ও বিজেপি বিরোধী হাওয়া তৈরি হয়েছে। এই লড়াইয়ে মানুষই জিততে চাইছে। মানুষের পাশে আমাদের থাকতে হবে। দেবজ্যোতিবাবু পরে বলেন, আমরা বুথ ধরে ধরে এগোচ্ছি। একই সুর বরানগরের সিপিএম প্রার্থী সায়নদীপ মিত্রের গলাতেও। তিনি বলেন, ২০১১ সালের পর বহু নেতা-কর্মী-সমর্থক ভয়ংকর অত্যাচারের শিকার হন। ভয়ের আগল ভেঙে তাঁরাও রাস্তয় বেরোচ্ছেন। তাঁদের নতুনভাবে সক্রিয় করছি আমরাও। মানুষের স্বার্থে এবার এই লড়াই সবাই জিততে চান।
তৃণমূলের মুখপাত্র সম্রাট চক্রবর্তী বলেন, বামেদের বিলম্বিত বোধোদয়। সাম্প্রদায়িক ও ভোটলুটেরা বিজেপির বাড়বাড়ন্ত তো সিপিএমেরই সৌজন্যে। আগে রাম পরে বামের রাজনীতি করতে গিয়ে সিপিএমই খাল কেটে কুমির এনেছে।
বিজেপির উত্তর শহরতলি জেলা সভাপতি চণ্ডীচরণ রায় বলেন, গত লোকসভা নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী প্রায় ৭০ হাজার ভোটে হেরেছিলেন। বাম প্রার্থী ভোট পেয়েছিলেন প্রায় আড়াই লক্ষ। এবার মানুষ বুঝে গিয়েছে, সিপিএম হল তৃণমূলের বি-টিম। সিপিএমকে ভোট দেওয়া মানে তৃণমূলকে ক্ষমতায় রাখা। নিজস্ব চিত্র