• ইভিএমের বোতামেই ‘বদলা’ নিতে চান মতুয়ারা, ‘প্রতারণা করেছে বিজেপি, ঠকিয়েছেন মোদির মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরও’
    বর্তমান | ০৪ এপ্রিল ২০২৬
  • দেবাঞ্জন দাস, বনগাঁ: ‘প্রতারিত হলাম! প্রতারণা করেছে বিজেপি, ঠকালেন মোদির মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরও।’ বিশ্বাসভঙ্গের ‘আক্ষেপ’ ঝরে পড়ছে হতাশ মুখগুলো থেকে বেরনো প্রতিটি শব্দে। ছিন্নমূল হয়ে ওপার বাংলার ফরিদপুর-গোপালগঞ্জের অমর সরকার, সঞ্জু বিশ্বাস, বৈদ্যনাথ বিশ্বাসরা ‘বাসা’ বেঁধেছিলেন চাঁদপাড়ার উদয়নপল্লিতে। নিরন্তর লড়াই চালিয়ে কোনোক্রমে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করছিলেন। আচমকাই মাথায় যেন বজ্রপাত! নির্বাচন কমিশনের এসআইআর গুঁতোয় বনগাঁ দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা থেকে সপরিবারে বাদ পড়েছেন এই মতুয়া উদ্বাস্তুরা। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আর মতুয়া সংঘাধিপতি শান্তনু ঠাকুরের একনিষ্ঠ সেই ভক্তদের আক্ষেপ—‘কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর স্বাক্ষরিত মতুয়া কার্ড কিনলাম। তাঁকে ভরসা করেছিলাম, বিশ্বাস করেছিলাম। এসআইআরে তা কোনো কাজেই এল না। নাগরিকত্বও জুটল না। কাকে জানাব এই দুঃখের কথা। ঠাকুরবাড়িতে তো ঢুকতেই দিচ্ছে না মন্ত্রীর সিকিওরিটিরা।’ 

    চৈত্রের অলস দুপুর। উদয়নপল্লির হরিচাঁদ ঠাকুর মন্দির চাতালে তখন জমাট ভিড়। সদ্য ‘বেনাগরিক’ হওয়া নারী-পুরুষের জটলা। বনগাঁ দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের অধীন চাঁদপাড়ার এই অংশে বর্তমানে ১৭৩ ও ১৭৪ নম্বর বুথের ভোটার তালিকায় বিচারাধীন এক হাজারের বেশি ভোটারের ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ’! তবে উদয়নপল্লি তো বটেই আশপাশের ঢাকুরিয়া, চৌধুরীপাড়া, নীলের মতো গ্রাম থেকে মানুষ এসে জড়ো হয়েছিলেন মন্দির প্রাঙ্গণে। সেখানেই দেখা মিলল স্থানীয় ১৭৩ নম্বর বুথের কট্টর বিজেপি কর্মী রিপন শীলের। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর মতুয়া সংঘাধিপতি মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরকেই আদর্শ নেতা হিসাবে মানেন। মিটিং-মিছিলে লোক জোটানো, ভোটের সময় প্রাণপাত পরিশ্রম করে নেতার লিড বাড়ানো—এসব রিপন করে চলেছেন গত কয়েক বছর ধরে। মতুয়াগড় চাঁদপাড়ায় ‘পদ্ম’ চাষের অন্যতম সেই কৃষককে এসআইআর পর্বে দলের বিএলএ-২ বানায় বিজেপি। রিপনের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকেই নারী-পুরুষের জটলা থেকে ভিড় ঠেলে সামনে এলেন তাঁর বাবা, নিরঞ্জন শীল। ‘কী লাভ হল বিজেপির সাথ দিয়ে! দিনরাত দলের জন্য পরিশ্রম করত ছেলেটা। এসআইআরের সময় বাড়ির সবাইকে পইপই করে বলেছিল, চিন্তা করো না। মন্ত্রী (শান্তনু) বলেছেন, মতুয়াদের সবার নাম থাকবে ভোটার তালিকায়। মিলবে নাগরিকত্ব...।’ নাগাড়ে বলছিলেন নিরঞ্জনবাবু। হঠাৎ একটু দম নিয়ে আবার হতাশার সুর— ‘আমার, স্ত্রী বেলারাণী, ছোটো ছেলে ত্রিনাথের নাম তো বটেই রিপনের নামটাও বাদ পড়েছে তালিকা থেকে!’

    বিজেপি কর্মী বলে এলাকায় পরিচিত অমল হালদার। বললেন, ‘দল আর নেতাদের ভরসা করেছিলাম। সবার সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির লাইনে দাঁড়িয়ে ক্যাম্প থেকে শান্তনু ঠাকুরের সই করা মতুয়া কার্ড জোগাড় করেছিলাম। তখন সবাই আশ্বস্ত করেছিল। তালিকা প্রকাশিত হল। স্ত্রী, পুত্রের সঙ্গে আমার নামও বাদ!’ নথিপত্র দেখাতে এনেছিলেন মাঝবয়সি লক্ষ্মীরানি সিংহ লস্কর। বাবা চিত্ত লস্কর ও মা রেখা লস্করের নাম ছিল ২০০২ সালে ভোটার তালিকায়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নাম উঠেছিল লক্ষ্মীদেবীরও। এবার অবশ্য বাদ পড়েছেন। পরিবারের তিনজনের নাম ‘বরাতজোরে’ রয়ে গিয়েছে তালিকায়। বৃদ্ধ তরণী সরকারের পরিবারের নয় সদস্যের মধ্যে আটজনই এখন ‘ডিলিটেড’ ভোটার। লক্ষ্মীদেবী আর তরণীবাবুর মতো ‘পদ্মপার্টি’র কট্টর সমর্থকরা ঘোষণাই করে দিলেন—‘জানবেন, যাঁদের নাম রয়ে গেল, তাঁরা কিন্তু ইভিএমে বোতাম টিপেই বদলা নেবেন।’ সায় দিল হরিচাঁদ ঠাকুর মন্দির চাতালের গোটা জমায়েত।   
  • Link to this news (বর্তমান)