তিরুবনন্তপুর: ‘রাজনৈতিক পেন্ডুলাম’ কেরল! পাঁচ বছর অন্তর শাসক বদলায় ‘ঈশ্বরের আপন ভূমি’তে। দীর্ঘদিনের এই ‘কিংবদন্তি’ ২০২১ সালে ভেঙে দিয়েছিলেন বর্ষীয়ান এক বাম নেতা। টানা দ্বিতীয়বার সরকার গড়েছিল সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বাম জোট এলডিএফ। পরপর দুবার মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন সিপিএমের সেই প্রবীণ নেতা— পিনারাই বিজয়ন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন তাঁর সামনে বিরল এক সুযোগ এনে দিয়েছে। জিতলে কেরলে বেনজিরভাবে ‘হ্যাটট্রিক’ করবে বামেরা। টানা তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার দুর্লভ রেকর্ড গড়বেন অশীতিপর বিজয়ন। আর হারলে? দেশের সর্বশেষ লালদুর্গও নিশ্চিহ্ন হবে। কারণ, একমাত্র কেরল ছাড়া ভারতের আর কোনও রাজ্যে এই মুহূর্তে আর বাম শাসন নেই।
কেরলে চিরাচরিত লড়াই বাম জোট এলডিএফ বনাম কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফের। বামেরা টানা দুবার ক্ষমতায় থাকায় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়াই ইউডিএফের সবচেয়ে বড় সম্বল। তবে ওমেন চান্ডির মতো প্রবীণ নেতার অবর্তমানে কংগ্রেস ‘মুখ’ কে, সেই প্রশ্ন উঠছে। হাইকমান্ডের সঙ্গে শশী থারুরের দীর্ঘ ‘ঠান্ডা লড়াই’ এবং কংগ্রেসের অন্দরে তীব্র গোষ্ঠী কোন্দলের ছায়া ভোটের ফলে পড়ার আশঙ্কা তীব্র। আর সেই সুযোগেই ‘এলডিএফ বনাম ইউডিএফ’-এর এই চিরারচিত ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ তৃতীয় পক্ষ হিসাবে নাম লিখিয়ে ফেলেছে বিজেপি। বামেদের হারিয়ে প্রথমবার ঐতিহ্যশালী তিরুবনন্তপুরম পুর কর্পোরেশন দখল করার পর থেকেই গেরুয়া শিবির উচ্ছ্বসিত। এবার কেরলের বিধানসভা নির্বাচনেও দাগ কাটতে মরিয়া পদ্ম ব্রিগেড। ফলে দ্বিমুখী নয়, দক্ষিণের এই রাজ্যে এবার ত্রিমুখী লড়াই। এমনিতেই এখানে জয়-পরাজয় স্থির হয় কম ভোটের ব্যবধানে। তার মধ্যে এবার লড়াই তিনমুখী হয়ে পড়ায় বহু আসনে হিসাব ওলটপালট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট বামেদের জন্য ‘আশীর্বাদ’ হয়ে এসেছিল। কেরলে বদলের ‘মিথ’ ছত্রখান করে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও এলডিএফের ঝুলিতে গিয়েছিল ৯৯টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ পেয়েছিল মাত্র ৪১টি। তবে গতবার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, কেরলে প্রথমবার বিজেপির খাতা খোলা। জয়ী হয়েছিল একটি আসনে। তবে নিছক আসন সংখ্যার দিকে তাকালে সবটা বোঝা যাবে না। ভোটপ্রাপ্তির হারের দিকে দেখলে বোঝা যাবে, রকেট গতিতে বিজেপির উত্থানের ইঙ্গিত মিলেছিল গতবারই। বামেদের দখলে গিয়েছিল ৪৫.৪৩ শতাংশ ভোট। কংগ্রেস জোট পেয়েছিল ৩৯.৪৭ শতাংশ। আর আচমকাই ১০ শতাংশের বেশি ভোট চলে গিয়েছিল বিজেপির ঝুলিতে, কেরলের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিক থেকে যা নিশ্চিতভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ।
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কেরলের দখল নিতে ব্যক্তিগতভাবে সক্রিয় রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। রাজ্যস্তরে কংগ্রেসের প্রধান মুখ বিরোধী দলনেতা ভি ডি সতীশন। ইউডিএফ শিবির থেকে পরিবর্তনের মুখ হিসাবে তাঁকেই প্রজেক্ট করা হচ্ছে। তবে শশী থারুর অধ্যায় পেরিয়ে কংগ্রেসের গলার কাঁটা গোষ্ঠী কোন্দল। তবে শক্তির জয়গা হল রমেশ চেন্নিথালার মতো প্রবীণ নেতার সাংগঠনিক দক্ষতা। এছাড়া প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী ওমেন চান্ডির পুত্র চান্ডি উমেনও ভোট-ময়দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন। দুর্নীতি ও বেকারত্বকে প্রচারের মূল ইস্যু করছে হাত শিবির। তুলনামূলক নবীন শক্তি বিজেপির প্রধান মুখ প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীব চন্দ্রশেখর। দলের প্রদেশ সভাপতি হিসাবে প্রচারেও মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন। এছাড়া রয়েছেন আরও এক প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভি মুরলীধরন। বেকারত্ব, রাজ্যের দৈন্য অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা সহ বিভিন্ন অভিযোগে প্রচার চালাচ্ছে পদ্ম শিবির। তবে সেসব পেরিয়ে বিজেপির যাবতীয় আশা-ভরসা মোদি ম্যাজিক। এই অবস্থায় দুর্গরক্ষায় বামেদের সেনাপতি নিশ্চিতভাবেই ৮০ বছর বয়সি মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। শবরীমালা সোনা চুরি কাণ্ড, দুর্নীতির অভিযোগ ও বেকারত্বের ইস্যুতে বিরোধীদের যাবতীয় অভিযোগের মধ্যেই হ্যাটট্রিকের লক্ষ্যে কোমর বাঁধছেন তিনি। আগামী ৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ। শেষ হাসি কার, জবাব মিলবে ৪ মে ফলপ্রকাশের দিন।