মালদহে জনসভায় তৃণমূলের পক্ষে জোর বার্তা মমতার, ভোটের আগে উত্তপ্ত রাজনীতি
দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৫ এপ্রিল ২০২৬
শনিবার প্রথম সভা ছিল মানিকচকে। সেখান থেকে তিনি পৌঁছন মালতীপুরে। সামসি কলেজ মাঠে আয়োজিত সভায় বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম দেখা যায়। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে নববর্ষের আগাম শুভেচ্ছা জানান মুখ্যমন্ত্রী। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে তিনি বলেন, ‘নববর্ষে আপনারা আম, আমসত্ত্ব উপহার দেন। এ বার সেই উপহার যেন তৃণমূল পায়।’ তাঁর এই মন্তব্যে উপস্থিত জনতার মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। এই সভা থেকে মালতীপুরের প্রার্থী আব্দুর রহিম বক্সী এবং রতুয়ার প্রার্থী সমর মুখোপাধ্যায়ের সমর্থনে ভোট চেয়ে তিনি বলেন, ‘তৃণমূলকে ভোট দিলে উন্নয়ন চলবে। অন্য দলকে ভোট দিলে উন্নয়ন থমকে যাবে।’
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা সকলের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে লড়াই করছি। আদালতে গিয়ে লড়াই করেছি বলেই বহু মানুষের নাম ফের তালিকায় উঠেছে।’ সাধারণ মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে তিনি আরও বলেন, কেউ নাম তুলতে সমস্যায় পড়লে দলীয়ভাবে সাহায্য করা হবে। মমতা বলেন, ‘গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আঘাতের প্রতিবাদে আমরা দিল্লি যাব। ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য আমরা সব রকম সাহায্য করব। এসআইআর নিয়ে আমি মামলা করেছিলাম বলেই ২২ লক্ষ মানুষের নাম উঠেছে। নিজে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলাম। আমরা সকলের ভোটাধিকার চাই।’
ইভিএম নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মালদহে সভায় উপস্থিত মহিলাদের সজাগ করে বার্তা দেন তিনি। বলেন, ‘ইভিএম কেন্দ্রীয় সরকার তৈরি করে। খারাপ হলে ভোট করতে দেবেন না! বিজেপি মনে রেখো, বদলা গণতন্ত্রের মাধ্যমে নেব। যতই মেশিন বদলাও, কিছু হবে না। মা-বোনেদের স্বার্থে, মাছ খাওয়ার স্বার্থে মানুষ বিজেপিকে ভোট দেবেন না।’
পাশাপাশি, কংগ্রেস বা সিপিএমকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মমতা। বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করে মমতা বলেন, ‘বিজেপি মিথ্যা ছড়ায়। মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। কংগ্রেস বা বামেদের ভোট দিয়ে কোনও লাভ নেই।’ তিনি বলেন, ‘ওদের ভোট দিয়ে কী হবে? একটা আসন নিয়ে ওরা তো সরকার গড়তে পারবে না।’
এদিন মৌসম নুরকেও আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, কিছু দিন আগে তৃণমূল ছেড়েছেন রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ মৌসম নুর। মালদহের মালতিপুরে সেই মৌসমের আসনে দাঁড়িয়েই তাঁকে কটাক্ষ করেন মমতা। বলেন, ‘মালদহের কোনও প্রতিনিধি লোকসভায় ছিল না বলে আমরা এই জেলার প্রতিনিধিকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলাম। অনেক দিন ছিলেন। ভোটের আগে তিনি অন্য দলে গিয়েছেন। তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু পলাতকদের মানুষ ক্ষমা করবে না। উনি তো ভোটে লড়ে সাংসদ হতে পারেননি। বিধায়কদের ভোটে জিতেছিলেন। আমার ভোটও পেয়েছিলেন। নিজে জীবনে রাজ্যসভায় যেতে পারিনি। এত সুযোগ পাওয়ার পরেও দলের বিরোধিতা ভোটের সময়! ভোট যেন না পায়।’
তাঁর দাবি, তৃণমূলই একমাত্র দল যা মানুষের জন্য কাজ করছে। কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও সরব হন তিনি। অভিযোগ করেন, তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক আধিকারিকদের বদলি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। মালদহের সাম্প্রতিক অশান্তির প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বহিরাগতদের উস্কানিতে এই ঘটনা ঘটেছে।’ একই সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক শক্তিকে আক্রমণ করে তিনি জানান, মানুষ এসব ষড়যন্ত্র বুঝে গিয়েছে।
সভায় বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন তিনি। লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, ছাত্রদের জন্য ঋণ প্রকল্প— এই সব উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যা বলেছি, তা করেছি। ভবিষ্যতেও করব।’ বিশেষ করে মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতার প্রসঙ্গ তিনি জোর দিয়ে তুলে ধরেন। এদিন সভা শেষে একটি অস্বাভাবিক ঘটনাও ঘটে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মালদহে এই ধারাবাহিক জনসভা তৃণমূলের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার কৌশল। ভোটের আগে এই জেলায় প্রভাব বিস্তারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে শাসক দল। মমতার বক্তব্যে যেমন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ছিল, তেমনই বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণও ছিল স্পষ্ট।