জয় সাহা
তিনি একটু অন্য রকম প্রার্থী। তাঁর প্রচারে অবশ্যই নিজের জন্য ও নিজের দলের জন্য ভোট চাওয়া আছে এবং বিরোধীদের ভোট না–দেওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু শুধু এগুলোই নেই। বরং, আরও বেশি করে আছে জলঙ্গি নদী বাঁচাও থেকে পরিবেশ রক্ষা, তুলে ধরা আছে কৃষিসঙ্কটের কথা এবং দাবি তোলা হয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকের অধিকার রক্ষা ও মহিলা বিড়িশ্রমিকদের হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারের।
এ বারের বিধানসভা ভোটে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ কেন্দ্রের সিপিআই–এমএল (লিবারেশন) প্রার্থী লাবণী জঙ্গী তাই একটু অন্য রকম। তাঁর ভোটের লড়াইটাও অন্য মাত্রার। গতে বাঁধা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে তাঁর প্রচার। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লাবণী মনে করেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার অলিন্দে সীমাবদ্ধ নয়, বরং উল্টোটা— খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত অনেক বেশি করে। তাই তিনি ভোটের ময়দানে নেমে সেই সব মানুষের দরজায় দরজায় যাচ্ছেন।
লাবণীর নিজের বেড়ে ওঠা কৃষ্ণনগর বিধানসভা এলাকারই ধুবুলিয়া অঞ্চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এয়ারফিল্ড থেকে শুরু করে দেশভাগের পরে ও পার থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষের লড়াই— এ সবেরই সাক্ষী এই এলাকা। এখানকার মানুষ বরাবরই সহাবস্থানে বিশ্বাসী। কিন্তু বর্তমান সময়ে এক শ্রেণির লোকের ঘৃণার রাজনীতি কিছুতেই মানতে না–পারা এই তরুণীর মনে হয়েছে, মাঠে নেমে তাঁর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসা খুব জরুরি। তিনি মনে করেন, আজকের দিনে পরিবেশরক্ষা কোনও শৌখিন বিষয় নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত। লাবণীর কথায়, 'জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম ও প্রধান শিকার হন খেটে খাওয়া কৃষক ও দিনমজুররাই।' তাই, এ বারের নির্বাচনে বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিআই–এমএল (লিবারেশন)-এর নবীন প্রার্থী পরিবেশকেই অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরছেন।
নির্বাচনী প্রচারে লাবণীর অন্যতম প্রধান বিষয় 'জলঙ্গি নদী বাঁচাও' আন্দোলন। তিনি জানাচ্ছেন, একদিকে জলঙ্গির জল শুকিয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে যে টুকু জল আছে, তাতে কারখানার দূষিত কালো বর্জ্য জল ঢুকে নদীর মাছ মরে যাচ্ছে। এর ফলে শম্ভুনগর বা পণ্ডিতপুর এলাকার মৎস্যজীবীরা চরম বিপাকে পড়ে ভিন রাজ্যে কাজ খুঁজতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসের প্রসঙ্গ টেনে লাবণী মনে করিয়ে দেন, নদী শুকিয়ে গেলে পাড়ের মানুষের জনজীবনের আর কোনও অস্তিত্ব থাকে না। নদীর পাশাপাশি হাঁসেডাঙার বিলের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ কর্পোরেটের দখলে চলে যাওয়া এবং বাহাদুরপুর ফরেস্টের চরম অবহেলা নিয়েও তিনি সরব। লাবণী জানাচ্ছেন, বিধানসভায় যেতে পারলে এলাকার বাস্তুতন্ত্র রক্ষা ও হারিয়ে যাওয়া দেশজ গাছ রোপণের দাবি তিনি জোরালো ভাবে তুলে ধরবেন। তাঁর প্রতিশ্রুতি, 'ভোটে জিতলে বৃক্ষরোপণ করব। নদীকে বাঁচাব।'
লাবণীর বক্তব্য, কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা এলাকার কর্মসংস্থানের অবস্থাও সঙ্গিন। গ্রামগুলোর প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ যুবক এখন পরিযায়ী শ্রমিক। ভিন রাজ্যে গিয়ে নিজের রাজ্যের পরিচয় ও ধর্মের কারণে ক্রমাগত নিগ্রহ ও হেনস্থার শিকার হচ্ছেন তাঁদের অনেকেই। ওই সব মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে লড়াই করতে তিনি বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি, সারের দাম বাড়া এবং আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় বিপর্যস্ত কৃষকদের পাশে থাকার বার্তাও তিনি দিয়েছেন। লাবণী সতর্ক করে বলেছেন, 'কৃষিতে নতুন প্রজন্ম না–এলে আগামী দিনে ভয়াবহ খাদ্যসঙ্কট দেখা দিতে পারে।'
এলাকার প্রায় পাঁচ হাজার মহিলা বিড়িশ্রমিকের বঞ্চনাও লাবণী জঙ্গীর প্রচারের আর একটি বড় দিক। ২০১১-র পর থেকে বিড়ি শ্রমিকদের বিশেষ কার্ড সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিনামূল্যে চিকিৎসা, বাসস্থান বা সন্তানদের বৃত্তির মতো সুবিধে থেকে তাঁরা এখন বঞ্চিত। লাবণীর দৃঢ় অবস্থান— বিধানসভায় গিয়ে ওই মহিলা বিড়িশ্রমিকদের হারানো অধিকার ফিরিয়ে আনাই হবে তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা এলাকাতেই রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম টিবি হাসপাতাল। তার হতশ্রী অবস্থা এবং এলাকায় একটিও কলেজ না–থাকার ক্ষোভও ভোটের প্রচারে লাবণীর বক্তব্যে স্পষ্ট।
তাই, তিনি সত্যিই অন্য রকম।