• গড় তাপমাত্রা বাড়ায় অনিশ্চিত খাদ্য-ভবিষ্যৎ: দুশ্চিন্তা ভারতের
    এই সময় | ০৫ এপ্রিল ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    অদূর ভবিষ্যতে উপযুক্ত পরিমাণে খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা যে দেশগুলোয় ক্রমশ কমছে, তাদের মধ্যে রয়েছে ভারতও। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে ভাবে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবী জুড়ে গড় তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে, তার সরাসরি প্রভাব খাদ্য উৎপাদনের উপরে পড়ছে। ভারতের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। দেশে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার বিপুল চাপ। যে কারণে ভারতের দুশ্চিন্তা অন্য বহু দেশের তুলনায় অনেকটাই বেশি। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইইডি)-এর নতুন একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে, গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের পতনের আশঙ্কা বেশি।

    আইআইইডি–র তরফে যে গবেষকরা এই সমীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা জানাচ্ছেন, এ বিষয়ে একটি নতুন 'খাদ্য নিরাপত্তা সূচক' তৈরি করা হয়েছে। সেই সূচক অনুযায়ী ভারতের অবস্থান উদ্বেগজনক। ওই সূচক অনুযায়ী দেশের বেসলাইন স্কোর ৫.৩১ হিসেবে ধার্য করা হয়েছে। ওই স্কোর বিশ্বের গড় সূচক ৬.৭৪-এর চেয়ে অনেকটাই নীচে। এমনকী, ব্রাজি়ল (৬.৭২), মেক্সিকো (৬.৩৬) ও ইন্দোনেশিয়ার (৫.৮৭) চেয়েও ভারত পিছিয়ে। একই সঙ্গে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কার কথা গবেষকরা জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে ভারতের বেসলাইন স্কোর ৫.৩১ থেকে কমে ৪.৯৬–ও হতে পারে। আর গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে, ওই স্কোর ৪.৫২-তেও নামতে পারে।

    আইআইইডি–র গবেষকরা দেখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়া ক্রমশ চরম হতে শুরু করলে প্রথমেই তার প্রভাব পড়ে খাবারের উপরে। পরিস্থিতি কঠিন হলে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তেই মানুষ প্রথমে ভালো মানের খাবারের অভাব টের পায়। তার পরে পরিস্থিতি যে দিকে যায়, তাতে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত খাবার টুকু জোগাড় করা কঠিন হয়ে ওঠে। গবেষকরা ১৬২টি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা–ব্যবস্থাকে চারটি মাপকাঠিতে বিচার করেছেন। প্রথমত, পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার পাওয়ার সুবিধে, দ্বিতীয়ত, ওই খাবার কতটা সাশ্রয়ী, তৃতীয়ত, খাবারের পুষ্টিগুণ কেমন এবং চতুর্থত, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা মজবুত। এগুলো ধরেই গাণিতিক মডেলে তৈরি করা হয়েছে স্কোর।

    হিসেব করে গবেষকরা দেখেছেন, শিল্প বিপ্লবের (১৮৫০) আগে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যে জায়গায় ছিল, তার চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উপরে উঠবে খুব তাড়াতাড়ি। আর এমনটা হলে নিম্ন-আয়ের দেশগুলো খাবার নিয়ে গুরুতর সমস্যায় পড়বে। বিশেষ করে দরিদ্র ও সংঘাত-পীড়িত দেশগুলো— যেখানে খাদ্য–ব্যবস্থা আগেই দুর্বল— সে সব দেশে খাবার পাওয়া এতটাই সমস্যার হবে যে, সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্যে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। বিশ্বের প্রায় ৪৫৬ কোটি মানুষ— অর্থাৎ মানবজাতির প্রায় ৫৯ শতাংশ এমন সব দেশে বাস করেন, যে সব দেশে বেসলাইন স্কোর বিশ্বের গড় ৬.৭৪-এর নীচে। গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি বাড়লে আরও প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ এই সীমার নীচে নেমে যাবেন। ফলে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার জন্য মানুষের সংগ্রাম আরও নির্মম হবে।

    আবার, প্রায় ৩১৯ কোটি মানুষ, অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪১ শতাংশ বর্তমানে এমন সব দেশে বসবাস করেন, যেগুলোর বেসলাইন স্কোর রয়েছে বিশ্বের গড়ের উপরে। ওই তালিকায় সবার উপরে আইসল্যান্ড (৯.২৬)। তার পরেই ডেনমার্ক (৯.১৭), অস্ট্রিয়া (৯.১৫), আয়ারল্যান্ড (৯.১৩) এবং বেলজিয়াম (৯.০৭)। তালিকায় সব চেয়ে কম স্কোর করা দেশগুলির মধ্যে রয়েছে সোমালিয়া (১.২৯)।

    তার সামান্য উপরে রয়েছে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (২.৫১), হাইতি (২.৫৭), মাদাগাস্কার (৩.১৫) এবং আফগানিস্তান (৩.৩১)। অর্থনৈতিক ভাবে খুবই দুর্বল দেশগুলোর এমন পরিস্থিতি নিয়ে আইআইইডি–র তরফে ক্লাইমেট রেজি়লিয়েন্স, ফিনান্স, লস অ্যান্ড ড্যামেজ বিভাগের ডিরেক্টর ঋতু ভরদ্বাজ বলছেন, 'এই গবেষণা দেখাচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যে সব দেশ সব চেয়ে কম দায়ী, সেই দরিদ্র দেশগুলোই সব চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে চলেছে।'

  • Link to this news (এই সময়)