এই সময়: শহরের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে বা ভাগাড়ে যাঁরা কাজ করেন সেই কর্মী বা ‘সাফাই-সাথীদের’ প্রায়শই ভুগতে হয় নানা রোগে। কারণ একটাই— অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এমনকী, ওই কর্মীদের একটা বড় অংশ নিজেদের নাবালক বা শিশুসন্তানদেরও ওখানে নিয়ে যান, বলা ভালো, যেতে বাধ্য হন। ওই নাবালক–নাবালিকাদের কেউ কেউ মা-বাবাকে কাজে সাহায্যও করে। ফলে, অবধারিত ভাবে রোগে ভুগতে হয় তাদেরও।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ বা হ্যাজ়ার্ডাস কাজে কেন ন্যূনতম সুরক্ষা–সরঞ্জাম দেওয়া হয় না, তা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত। সেই মামলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল তৎকালীন প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানমের ডিভিশন বেঞ্চ। ‘সাফাই–সাথীদের’ স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটা জানতে চেয়ে পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কাছে হাইকোর্ট হলফনামা তলব করেছিল। এমনকী, এ ব্যাপারে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) চালু করার কথাও বলেছিল হাইকোর্ট। সেই হলফনামায় পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ সম্প্রতি হাইকোর্টকে জানায়, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পরেই তারা রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরকে এসওপি চালু করার জন্য চিঠি পাঠিয়েছিল। ওই দপ্তর কোনও ব্যবস্থা যে নেয়নি, সেটাও জানানো হয় পর্ষদের হলফনামায়। মামলাকারী সুভাষ দত্তর অভিযোগ, তেমন সন্তোষজনক ব্যবস্থা এখনও নেওয়া হয়নি। এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কী নির্দেশ দেয়, সেটা পরবর্তী শুনানিতে জানা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চিফ ইঞ্জিনিয়ার স্বরূপকুমার মণ্ডল তাঁর হলফনামায় জানিয়েছেন, তাঁদের তরফে পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের প্রধান সচিবকে চিঠি দিয়ে এসওপি চালু করতে বলা হয়। কারণ, ওই দপ্তরই ভাগাড়ের নিয়ন্ত্রক। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই চিঠির কোনও উত্তর আসেনি। এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ফের একবার রিমাইন্ডার পাঠিয়ে পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরকে পর্ষদ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানায়, কারণ মামলাটি আগামী মার্চে শুনানির জন্য তালিকায় ছিল।
তবে পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের জন্য পর্ষদ একটি খসড়া এসওপি তৈরি করেছে। তার অন্যতম প্রধান হলো, প্রত্যেক সাফাই–সাথীকে স্থানীয় পুরসভা বা প্রশাসনের কাছে নাম নথিভুক্ত করতে হবে এবং তাঁদের নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। খসড়া এসওপি–তে বলা হয়েছে, ডাম্পিং গ্রাউন্ডের বিপজ্জনক পরিবেশে কোনও ভাবেই শিশুদের কাজ করতে দেওয়া যাবে না। তাদের কোনও প্রবেশাধিকার থাকবে না। কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম, টুপি, পা ঢাকা জুতো, দস্তানা, মাস্ক এবং স্যানিটাইজ়ার থাকা নিশ্চিত করতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। কাজের জায়গায় পর্যাপ্ত পরিস্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। প্রতি ছ’মাস অন্তর অভিজ্ঞ মেডিক্যাল টিম দিয়ে সমস্ত কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হবে।
২০২৩–এর জুলাইয়ে কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম ও বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ এর আগে স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, ডাম্পিং গ্রাউন্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রে সাফাই–সাথীদের জীবনের ঝুঁকির বিষয়টি কোনও ভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে রাজ্য সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ করতে হবে।
ধাপা, মোল্লাবেলিয়া, বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন ডাম্পিং গ্রাউন্ডগুলির সমস্যা দীর্ঘদিনের পুরোনো। মামলায় সুভাষ অভিযোগ করেছিলেন যে, ক্ষতিকর মিথেন গ্যাসের জন্য জঞ্জালের গাদায় সব সময়েই আগুন জ্বলে, ধোঁয়া বেরোয়। সেখান থেকে বর্জ্য নিষ্কাশনের কাজে যুক্ত সাফাই-সাথীদের অধিকাংশই মহিলা। তাঁদের না–আছে পা ঢাকা জুতো, না–আছে কোনও গ্লাভস, মাস্ক-সহ অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম। এর আগে জাতীয় পরিবেশ আদালতেও বিষয়টি নিয়ে সুভাষ দত্ত মামলা করেছিলেন। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল থেকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়, সেটা কার্যকর হয়নি। তার জন্য হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কোনও স্থানীয় প্রশাসন এই সমস্যার দিকে নজর দিচ্ছে না।