• অধীর চৌধুরীর বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে শোরগোল
    আজকাল | ০৫ এপ্রিল ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে নজরকাড়া কেন্দ্র বহরমপুর। প্রায় ৩০ বছর পর ফের একবার বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অধীর চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে নবগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসের প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছিলেন অধীর চৌধুরী। তার তিন বছরের মধ্যেই তিনি লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর কেন্দ্র থেকে জিতে দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

    ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী ইউসুফ পাঠানের কাছে পরাজয়ের পর গত প্রায় দু'বছর সক্রিয় রাজনীতিতে অধীর চৌধুরীকে তেমনভাবে দেখা যায়নি। রাজ্যে 'ডুবন্ত কংগ্রেসের হাল' ধরতে এআইসিসি এবছর ফের একবার অধীর চৌধুরীর উপর ভরসা করেছে। বহরমপুর কেন্দ্র থেকে তিনি নিজে যেমন লড়ছেন তেমনই মুর্শিদাবাদ জেলার কোন কেন্দ্রে কে প্রার্থী হবেন তা একা হাতে ঠিক করেছেন অধীর চৌধুরী। 

    নির্বাচনী প্রচারে বার হয়ে গত দু'দিন বহরমপুর শহরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবল বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছেন অধীর চৌধুরী। তবে এরই মাঝে নিজের দলের কর্মী সমর্থকদেরকে 'চাঙ্গা' করতে গিয়ে অধীর চৌধুরী প্রকাশ্য নির্বাচনী সভায় বিতর্কিত মন্তব্য করলেন।  

    শনিবার রাতে বহরমপুর শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মাছমারা এলাকায় একটি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অধীর চৌধুরী বলেন," বহু মস্তানকে রিপেয়ার করে ,সাইজ করে বড় হয়েছে অধীর চৌধুরী। আমরা এমনি এমনি অধীর চৌধুরী হয়ে যায়নি। বহরমপুর শহর এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় বহু মস্তান দেখেছি। তাদেরকে রিপেয়ার করে সাইজ করে বড় হয়েছি। নির্বাচনের পর আবার রিপেয়ার করা শুরু হবে।"

    নির্বাচনী এই জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অধীর চৌধুরী বলেছেন,"বহরমপুর শহরকে সন্ত্রাস মুক্ত, ভয় মুক্ত রাখতে হবে। এটা পুরসভার নির্বাচন নয় যে পুলিশ তৃণমূল নেতাদের ইচ্ছামতো চলবে। আমি নির্বাচন কমিশনকে 'হুক' দিয়েছি। তাই পুলিশ এখন আমার পেছনে দৌড়াচ্ছে। এলাকার মানুষ মনে রাখবেন আমাদেরকে ভয় পেলে চলবে না।"

    দলের কর্মীদেরকে 'উজ্জীবিত' করার জন্য অধীর চৌধুরীর এই বার্তা সমাজমাধ্যমের পাতায় ছড়িয়ে পড়তেই (যার সত্যতা আজকাল ডট ইন যাচাই করেনি) বিতর্কের ঝড় উঠেছে।  তৃণমূল নেতৃত্বের তরফ থেকে দাবী করা হচ্ছে, অধীর চৌধুরীর আসল রূপ এইবার বেরিয়ে পড়েছে। 

    রাজ্যে বাম শাসনকালেও মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেসের 'গড়' হিসেবে রাজ্যে পরিচিত ছিল। একসময় এই জেলার একাধিক পঞ্চায়েত সমিতি, গ্রাম পঞ্চায়েত এমনকি জেলা পরিষদও কংগ্রেসের দখলে ছিল।  জেলার বেশিরভাগ বিধায়কও কংগ্রেসেরই ছিলেন।। তার সিংহভাগ কৃতিত্ব সকলে অধীরকেই দেন। কিন্তু বর্তমানে মুর্শিদাবাদ জেলায় কংগ্রেসের একক ক্ষমতায় দখল করা একটি গ্রাম পঞ্চায়েত পর্যন্ত নেই। 

    তবে মুর্শিদাবাদ জেলার আড়ালে আবডালে কান পাতলে এখনও অধীর চৌধুরীর সম্পর্কে বহু 'মিথ' শোনা যায়। ১৯৯৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অধীর চৌধুরীর প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচার করতে পারেননি। পুলিশের খাতায় 'পলাতক' অবস্থায় তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। অধীর ঘনিষ্ঠরা তাঁর বক্তব্য ক্যাসেটে রেকর্ড করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সেই সময় প্রচার করতেন।

    বহরমপুর শহরে একসময় 'রবিনহুড' ভাবমূর্তি ছিল অধীর চৌধুরীর। মুর্শিদাবাদ জেলার প্রচুর মহিলা একসময় বিশ্বাস করতেন অধীর চৌধুরীর জন্যই তাঁরা বহরমপুর শহরে গভীর রাত পর্যন্ত নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারেন। মহিলাদের সঙ্গে অসভ্য- অভব্য আচরণ করার জন্য অনেক কুখ্যাত গুন্ডা অধীর চৌধুরীর গোপন ডেরায় 'রিপেয়ার এবং সাইজ' হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। তবে এই ঘটনারগুলোর সত্যতা কোনওদিনই জানা যায়নি। 

    বাম আমলে মুর্শিদাবাদ জেলায় অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে খুনের মত একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠেছে।  একাধিকবার খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন অধীর চৌধুরী। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য অধীর চৌধুরীর জমা দেওয়া নির্বাচনী হলফনামা থেকে পরিষ্কার আজ পর্যন্ত কোনও আদালত তাঁকে ফৌজদারি অপরাধে সাজা দেয়নি। 

    আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে অধীর চৌধুরী নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা জমা দিয়েছেন তাতে তিনি জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে তাঁর নাম দিয়ে রাজ্যের দু'টি থানা- বহরমপুর এবং হরিশ্চন্দ্রপুরে মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর পাশাপাশি মালদা জেলার চাঁচোল এসিজেএম আদালত এবং মুর্শিদাবাদের বহরমপুর আদালতে  আরও পাঁচটি 'জিআর' মামলা রয়েছে। 

    অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে নতুন বিএনএস আইনে কোনও মামলা এখনও না থাকলেও আইপিসির একাধিক ধারা এবং পিডিপিপি এবং এমপিও আইনে মামলা রুজু রয়েছে। অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে দাঙ্গা, মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা ছড়ানো, অবৈধভাবে কাউকে আটকে রাখা, ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা, সরকারি কর্মীকে কাজে বাধা দেওয়া,খুনের চেষ্টা, নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে দু'টি ভিন্ন দলের মধ্যে বৈরিতা তৈরীর মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। যদি এই মামলাগুলোর কোনওটিতেই তাঁর বিরুদ্ধে এখনও চার্জই গঠন হয়নি বলে জানা গিয়েছে। 

    একদা অধীর ঘনিষ্ঠ বর্তমানে জেলা তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন,অধীর চৌধুরী জীবনের বহু 'কালো অধ্যায়ের' সাক্ষী তাঁর সঙ্গে থাকা বহু পুরনো কংগ্রেসকর্মীরা। কিন্তু কোনও ঘটনারই প্রমাণ বা সাক্ষী অধীর চৌধুরী রাখেননি।তাই তিনি অতীতে কী অপরাধ করেছেন তার কোনওটিই প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

     
  • Link to this news (আজকাল)