এই সময়: ভোট ঘোষণার পরে এই প্রথম প্রধানমন্ত্রীর রাজ্য সফর। সম্প্রতি মালদার মোথাবাড়িতে বিচারকদের ঘেরাও এবং হেনস্থা করার যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তাকে নরেন্দ্র মোদী হাতিয়ার করবেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা ছিল। দলের নেতারা চেয়েছিলেন মোথাবাড়ি নিয়ে সরব হোন মোদী। হলেনও।
রবিবার কোচবিহারের নির্বাচনী সভা থেকে মোদী দাবি করেন, মোথাবাড়ির ঘটনা তৃণমূলের নির্মম সরকারের ‘মহাজঙ্গলরাজ’–এর প্রমাণ। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আক্ষেপ, যে রাজ্যে বিচারকদেরই নিরাপত্তা নেই, সে রাজ্যে সাধারণ মানুষের হাল কেমন সেটা বোঝাই যাচ্ছে! এর সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের নিয়েও অভিযোগ শোনা গিয়েছে তাঁর ভাষণে। ভারত সরকার অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দেশের বাইরে পাঠানোর কাজ শুরু করেছে বলে কোচবিহারের সভা থেকে দাবি করে তাঁর আক্ষেপ, ‘বাংলার তৃণমূল সরকার অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়েছে।’ মোদীর সংযোজন, ‘এ কারণেই তৃণমূল সরকার এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি পাকাচ্ছে। যাতে অনুপ্রবেশকারীরা ধরা না পড়ে। ওরাই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক।’
বাংলায় ‘মহাজঙ্গলরাজ’ চলছে বলে হামেশাই দাবি করেন বিজেপি নেতারা। এমনকী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখেও একাধিকবার শোনা গিয়েছে এই ‘মহাজঙ্গলরাজ’ থেকে বাংলাকে নিষ্কৃতি দেওয়ার আশ্বাস। মালদার মোথাবাড়িতে বিচারকদের আটকে রাখার ঘটনাকে হাতিয়ার করে এ দিন সেই ‘মহাজঙ্গলরাজ’ তত্ত্বেই নতুন ভাবে শান দিলেন নমো।
মালদার ঘটনার পরেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, এই ঘটনার সঙ্গে তৃণমূলের কোনও যোগসূত্র নেই। বরং বাংলাকে বদনাম করার জন্য বিজেপি–ই পরিকল্পনামাফিক মোথাবাড়িতে গোলমাল পাকিয়েছে বলেই দাবি করেছিলেন মমতা। মোদীর ‘মহাজঙ্গলরাজ’ তত্ত্বকে খারিজ করে মমতার দেওয়া সেই যুক্তিগুলিকে সামনে রেখেই এ দিন পাল্টা আক্রমণে নামে তৃণমূলও।
মালদার মোথাবাড়িতে ভোটার তালিকা থেকে স্থানীয়দের নাম কাটা হচ্ছে এই ‘প্রচারের জেরে’ সেখানে বিচারকদের আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছিল গত বুধবার। টানা ছ’ঘণ্টা আটক ছিলেন সাত বিচারক! বাংলায় বিধানসভা ভোটের মুখে এই ঘটনার অভিঘাত যে তীব্র ভাবেই পড়তে চলেছে এবং বিরোধীরা যে এই ইস্যুটি সহজে হাতছাড়া করতে চাইবে না সেটা রবিবার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেই স্পষ্ট।
বাংলার বিজেপি নেতা–কর্মীরা চেয়েছিলেন, রবিবার কোচবিহারের নির্বাচনী সভা থেকে মোথাবাড়ি ইস্যুতে মমতার সরকারকে চাঁছাছোলা ভাষায় আক্রমণ করুন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের হতাশ করেননি মোদী। কোচবিহারের রাসমেলার মাঠের নির্বাচনী সভা থেকে কালিয়াচকের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তিনি বলেন, ‘মালদায় বিচারকদের বন্দি বানিয়ে রাখা হয়েছিল। গোটা দেশ দেখেছে। এ কেমন সরকার চলছে বাংলায়! যেখানে বিচারক এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই সুরক্ষিত নয়, সেখানে এই সরকারের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার আশা না করাই ভালো।’ মালদার ঘটনা যে ‘জঙ্গলরাজ’–এরই উদাহরণ সেটা বোঝাতে মোদীর সংযোজন, ‘মালদায় যা হয়েছে তা শুধু তৃণমূল সরকারের ধৃষ্টতাই নয়, তা বাংলায় চলা নির্মম সরকারের মহাজঙ্গলরাজের সব থেকে বড় প্রমাণ। তৃণমূল সাংবিধানিক সংস্থাগুলির গলা টিপে ধরছে। বাংলায় এখন পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, দেশের শীর্ষ আদালতকে বাধ্য হয়ে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।’
এর জবাবে এ দিন বিকেলে সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, ‘মালদার ঘটনায় বিজেপির ষড়যন্ত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফাঁস করে দিয়েছিলেন। মালদায় অশান্তি করার জন্য ভিন রাজ্য থেকে লোক এসেছিল। তারা সিআইডির হাতে ধরা পড়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী বাংলায় দৌড়ে এসেছেন নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করতে।’ তাঁর সংযোজন, ‘বিজেপি বাংলায় অরাজকতা চায়। বারবার পিছনের দরজা দিয়ে ওরা বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন করতে চেয়েছে। মালদায় ষড়যন্ত্র করার জবাব বাংলার মানুষ বিজেপিকে ভোট বাক্সে দেবে।’
মালদায় বিচারকদের আটকে রাখার ঘটনা এবং এসআইআর বা ‘সার’ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের বিরোধিতার মধ্যে নির্দিষ্ট যোগসূত্র আছে বলে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি। এ দিন মোদী সরাসরি সে কথা না বললেও ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, মালদার ঘটনা, ‘সার’–এ নাম বাদ, অনুপ্রবেশ সমস্যা — সবই এক সুত্রে গাঁথা। প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যায়, ‘তৃণমূল জমানায় বাংলার সীমান্তবর্তী জেলাগুলির জনবিন্যাস দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। তৃণমূলের সরাসরি সহযোগিতা পাচ্ছে অনুপ্রবেশকারীরা। তাদের সিন্ডিকেটে নিয়োগ করছে তৃণমূল। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ঝুঁকি বাড়ছে।’