এই সময়: তৃণমূলের যে নেতাদের তলায় তলায় বিজেপির সঙ্গে আঁতাঁত রয়েছে, তাঁদের সতর্ক করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কোন নেতারা পদ্ম–শিবিরের কাদের সঙ্গে রাতে বৈঠক করেছেন, কারা বিজেপির কার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন — সব তাঁর নজরে রয়েছে বলে কড়া বার্তা দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক।তৃণমূলনেত্রী, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ বারের ভোটে টিকিট না পাওয়ায় ‘বিক্ষুব্ধ’দের ইঙ্গিত করে কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেছেন। সব মিলিয়ে রবিবারের প্রচার থেকে কড়া বার্তাই দিয়েছেন জোড়াফুল শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব।
দিন কয়েক আগে নন্দীগ্রামের কর্মিসভায় বিষয়টি তুলেছিলেন অভিষেক। ২০২১–এর বিধানসভা ভোটে ওই কেন্দ্রে নিচুতলার কিছু নেতা তলায়–তলায় বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশ রেখে চলেছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বারের ভোটে আগে থেকেই দলবিরোধী কাজে যুক্তদের সতর্ক করে দিচ্ছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। আগামী দিনে তৃণমূল যে এঁদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করবে, তা খোলাখুলি বুঝিয়ে দিয়েছেন অভিষেক।
রবিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোসাবার সভায় তিনি বলেন, ‘তৃণমূল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। যদি কেউ ভাবেন ষড়যন্ত্র করে দলকে দুর্বল করবেন, তা হলে ৪ তারিখ (৪ মে) বিকেলে দেখা হবে বন্ধু। তার পরে বাকি জীবন কী ভাবে কাটাবেন, মাথায় রাখবেন। মানুষ আছে তৃণমূলের সঙ্গে, মানুষ তৃণমূলকে জেতাবে।’ পাশাপাশি, বিজেপি ৫০– এর নীচে নেমে যাবে বলেও মন্তব্য করেন অভিষেক।
তৃণমূলের যে নেতারা অন্তর্ঘাত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তাঁদের তিনি সতর্ক করে দেন গোসাবা এবং পূর্ব বর্ধমানের রায়নার সভা থেকে। রায়নায় অভিষেক বলেন, ‘দল সবার উপরে নজর রাখে। কেউ কেউ রাতের অন্ধকারে বিজেপির থেকে টাকা নিয়ে কয়েকটি জায়গায় তৃণমূলকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। আমি তাঁদের সতর্ক করে দিয়ে যাচ্ছি। আগামী ৪ তারিখ বিকেলে দেখা হবে। রায়নায় ৫০ হাজারের বেশি ব্যবধানে জিতবেন তৃণমূলের প্রার্থী।’
গোসাবা বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের যে নেতারা চুপচাপ পদ্ম–ব্রিগেডের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জোড়াফুলকে দুর্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তাঁদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘সবার উপরে আমার নজর রয়েছে। কয়েকটি অঞ্চলে কেউ কেউ ভাবছেন, তৃণমূলকে দুর্বল করবেন। আমি তাঁদের চিহ্নিত করেছি। আমি জানি, এটা কারা করছেন, কোথা থেকে টাকা নিয়ে করছেন। রাতের অন্ধকারে কার সঙ্গে মিটিং করেছেন, তার খবরও আছে। যাঁর সঙ্গে মিটিং করতে গিয়েছেন, তিনিই আমাকে খবর দিয়েছেন।’
প্রার্থিতালিকা বেরোনোর পরেই তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক–সহ নেতাদের একাংশ ক্ষোভ–বিক্ষোভ শুরু করেছেন। দলের তরফে যে সকলকে টিকিট দেওয়া সম্ভব নয়, পুরোনোদের পাশাপাশি নতুনদেরও সুযোগ দেওয়া দরকার এবং গোষ্ঠীকোন্দল, মান–অভিমান ভুলে সকলকে প্রচারে ঝাঁপাতে হবে — ইতিমধ্যে একাধিক বার এই বার্তা দিয়েছেন স্বয়ং মমতা। অভিষেকও দিন–রাত একাধিক জনসভা করে চলেছেন, পারফর্ম্যান্সে জোর দিয়ে একাধিক কেন্দ্রের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন দলীয় নেতাকর্মীদের। তার পরেও কিছু লোক বিজেপির সঙ্গে আঁতাঁত রেখে চলায় এ বার কড়া বার্তার পথ ধরলেন দু’জনেই।
যেমন, টিকিট না পেয়ে বিদায়ী বিধায়কদের কেউ কেউ দলের বিরোধিতা শুরু করেছেন। কেউ আবার দলই বদলে ফেলেছেন। মুর্শিদাবাদের ফরাক্কায় জোড়াফুলের বিদায়ী বিধায়ক মনিরুল ইসলাম টিকিট না পেয়ে ‘বিক্ষুব্ধ’। তৃণমূলের প্রার্থীর বিরুদ্ধেই মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন তিনি। এই প্রেক্ষাপটে রবিবার মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের সভা থেকে মনিরুলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন মমতা। বিদায়ী বিধায়কের নাম না করে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘ফরাক্কায় যাঁকে আমরা টিকিট দিইনি, শুনেছি তিনি নাকি (ভোটে) দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে আবেদন করব, দলের স্বার্থে (মনোনয়নপত্র) প্রত্যাহার করবেন। যদি না করেন, জেলার চেয়ারম্যান খলিলুর সাহেবকে বলছি, তাঁকে দল থেকে সাসপেন্ড করবেন। আমার তাঁকে দরকার নেই, আমার আমিরুলকে (ফরাক্কার তৃণমূল প্রার্থী আমিরুল ইসলাম) দরকার।’
কেন মনিরুলকে টিকিট দেওয়া যায়নি? মমতার ব্যাখ্যা, ‘যে কর্মীরা পরিশ্রম করেন, সবাই টিকিট পান? যাঁরা এজেন্ট হন, সবাই টিকিট পান? একটা সিটে তো একজন টিকিট পান। যিনি কাজ করবেন, তিনি টিকিট পাবেন। যাঁরা দলের বাইরে কাজ করবেন, তাঁরা আমাদের কেউ নন। যাঁরা দলকে অসম্মান করবেন, তাঁদের রেয়াত করা আমাদের কাজ নয়।’ যদিও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন বলে কোনও ইঙ্গিত দেননি মনিরুল।
আবার অভিষেকের পর্যবেক্ষণ, বুথে বসার বা মিছিল–মিটিং করার লোক নেই বলে টাকার লোভ দেখাচ্ছে বিজেপি। তৃণমূলের লোকসভার দলনেতার কথায়, ‘বিজেপির ফ্ল্যাগ লাগানো, প্রচার করা, মিছিল করা, পোস্টার লাগানোর লোক নেই। ফোন করে টাকা দিয়ে বুথে বসতে বলবে।’ ২০২৪–এর লোকসভা ভোটে যে সব বুথে তৃণমূল পিছিয়ে ছিল, সেখানে এ বার লিড নিতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছেন অভিষেক।