এই সময়, হাওড়া: রাজনীতির প্রচারের আলো থেকে অনেক দূরে, নিঃশব্দে কাজ করে যাওয়া কিছু মানুষই সমাজের প্রকৃত ভিত্তি গড়ে তোলেন। উত্তর হাওড়ার সিপিআই (এম) প্রার্থী গৌতম রায় সেই বিরল মানুষেরই একজন। যাঁর জীবনজুড়ে ছড়িয়ে আছে মানবিকতা, দায়বদ্ধতা এবং নিরলস পরিশ্রমের গল্প।
হাওড়া জেলায় বর্তমানে প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার প্রতিবন্ধী মানুষ বসবাস করেন। ২০১১ সালের জনগণনায় এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৬ হাজার। সময়ের সঙ্গে সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে তাঁদের প্রয়োজন, সমস্যার জটিলতা এবং সরকারি পরিষেবা পাওয়ার লড়াই। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে এক নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছেন গৌতম রায়।
পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন অধ্যাপক। ১৯৮৪ সালে শিক্ষকতা শুরু করেন, প্রথমে খড়গপুর কলেজে এবং পরে নরসিংহ দত্ত কলেজে যোগ দেন। ২০২২ সালে অবসর নেওয়ার পরেও তাঁর কর্মযজ্ঞ থেমে থাকেনি। বরং, সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ করার সময় যেন আরও বেড়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে গৌতম রায়ের অবদান উল্লেখযোগ্য। কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিবন্ধী সম্মেলনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি হাওড়া জেলায় সংগঠিত ভাবে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি এই সংগঠনের জেলার সম্পাদক। তাঁর উদ্যোগে ৬০০-রও বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ ভাতা পেয়েছেন। অনেকেই যাঁরা দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে হয়রানির শিকার হতেন, তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে সঠিক পথ দেখিয়েছেন তিনি। শুধু ভাতা নয়, সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অসংখ্য মানুষকে প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেট, আধার কার্ড এবং ইউনিক ডিজ়েবিলিটি আইডেন্টিটি কার্ড পেতে সাহায্য করেছেন তিনি। প্রায় ৩৫০ জনের এই আইডি কার্ড তৈরির কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজে ফর্ম পুরণ করে, দপ্তরে নিয়ে গিয়ে কাজ সম্পন্ন করিয়েছেন, যা আজকের দিনে বিরল উদাহরণ।
প্রতি অবসরের পরেও তাঁর দিনের রুটিন বদলায়নি। উত্তর হাওড়ার শৈলেন্দ্র বসু রোডের একটি আইসিডিএস কেন্দ্রে আগে প্রতি দিন রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বসতেন তিনি। এখন সপ্তাহে তিনদিন বসেন। কোনও প্রচার বা প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, শুধুই মানুষের সমস্যার সমাধান। কেউ ভাতার আবেদন নিয়ে আসেন, কেউ সার্টিফিকেটের, সবার কথা ধৈর্য সহকারে শোনেন তিনি এবং প্রয়োজনীয় দিশা দেখান।
প্রতিবন্ধীদের পাশাপাশি, বস্তি এলাকার উন্নয়নেও তাঁর কাজ সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পিলখানা এলাকায় রেললাইনের ধারের বস্তিতে বহু বছর বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। এক মর্মান্তিক ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর পরে গৌতম রায় উদ্যোগী হন। প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে চোরাই বিদ্যুৎ বন্ধ করানো এবং ঘরে ঘরে বৈধ মিটার সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে, ওই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে।
২০০৩ সালে হাওড়া পুরসভার কাউন্সিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মেয়র পারিষদ হন। দু'বার হাওড়া পুরসভার কাউন্সিলার ছিলেন। সে ই সময়েও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, বিশেষ করে প্রান্তিক ও অবহেলিত অংশের। গৌতম রায়ের পরিবারেও জনসেবার ঐতিহ্য রয়েছে। তাঁর দাদু হরিবংশ রায় ১৯৩৭সালে হাওড়া পুরসভার কমিশনার ছিলেন এবং তাঁর বাবা ছিলেন নরসিংহ দত্ত কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। সেই উত্তরাধিকারই যেন নতুন ভাবে রূপ পেয়েছে তাঁর কাজে।
তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে, গৌতম রায়ের পরিচয় একটাই- তিনি মানুষের মতো মানুষ। দল-মত নির্বিশেষে এলাকার মানুষ তাঁ কে ভালোবাসেন এবং তাঁর উপরে ভরসা করেন। তাঁর নিজের কথায়, 'সমাজের একটি বড় অংশ প্রতিবন্ধী। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।'
নির্বাচনের আবহে যখন প্রতিশ্রুতির ঝড় ওঠে, তখন গৌতম রায়ের মতো মানুষরা তাঁদের কাজ দিয়েই প্রমাণ করেন, মানবিকতাই সবচেয়ে বড় রাজনীতি। উত্তর হাওড়ায় তাই তিনি শুধুই এক প্রার্থী নন, তিনি এক বিশ্বাসের নাম।