কোন মুখে ভোট চাইতে এসেছেন? গ্রামেগঞ্জে আমজনতার রোষে বিজেপি
বর্তমান | ০৬ এপ্রিল ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বীরভূমের রাজনৈতিক সমীকরণ তপ্ত হতে শুরু করেছে। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের উন্নয়নের খতিয়ান নিয়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বিজেপি প্রার্থীদের পড়তে হচ্ছে জনরোষের মুখে। সিউড়ি থেকে দুবরাজপুর কিংবা বোলপুর থেকে সাঁইথিয়া, সর্বত্রই চিত্রটা একইরকম। গেরুয়া শিবিরের প্রার্থীরা এলাকায় ঢুকলেই ধেয়ে আসছে হাজারো প্রশ্ন। কোন মুখে ভোট চাইতে চাইতে এসেছেন? এতদিন কোথায় ছিলেন? রান্নার গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে যখন হেঁশেলে আগুন জ্বলছে, তখন আপনাদের সরকারের সুরাহা কোথায়? এতে বিড়ম্বনায় পড়ছে গেরুয়া শিবির।
এই জনরোষের এক চরম প্রতিফলন দেখা গিয়েছে গত শুক্রবার। দুবরাজপুর ব্লকের লোবা পঞ্চায়েতের বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রচারে গিয়েছিলেন দুবরাজপুর বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী তথা বিধায়ক অনুপকুমার সাহা। সেখানে তাঁকে ঘিরে দফায় দফায় বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় বাসিন্দারা। গত পাঁচ বছরে বিধায়ক হিসেবে তিনি কী কী উন্নয়ন করেছেন তার শ্বেতপত্র দাবি করেন গ্রামবাসীরা। এমনকী, একশো দিনের কাজ কেন বন্ধ করে রেখেছে কেন্দ্রের বিজেপির সরকার, তা নিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়তে হয় প্রার্থীকে। এনিয়ে প্রার্থীর সঙ্গে রীতিমতো ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ক্ষুব্ধ জনতার প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে কার্যত এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন বিজেপি প্রার্থী।
একই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে হয়েছে সিউড়ির বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়কেও। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ইস্যুটিকে তৃণমূল অত্যন্ত সুকৌশলে জনমানসে প্রচার করেছে যে, এটি বিজেপিরই কারসাজি। ফলে প্রচারে বেরিয়ে জগন্নাথবাবুকে শুনতে হচ্ছে, কেন এত মানুষের নাম বাদ যাচ্ছে? সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল যে, বহু বিজেপি প্রার্থী এখন সেইসব গ্রাম কার্যত এড়িয়েই চলছেন। প্রার্থী হওয়ার পর থেকে জগন্নাথকেও শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার পাশ দিয়ে তিনি বেরিয়ে যাচ্ছেন।
তৃণমূল প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, মানুষ আর বিজেপির ভাঁওতায় ভুলছে না। দ্রব্যমূল্য যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে মানুষের সংসার চালানোই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। একুশের নির্বাচনেই বাংলার মানুষ ওদের প্রত্যাখ্যান করেছিল। এবার মানুষ ওদের বিদায় জানাবে। সিউড়ির বাসিন্দা তনুশ্রী রায়ের ক্ষোভ, আমাদের করের টাকায় ওরা সরকার চালিয়ে আমাদেরই পেটে লাথি মারছে। দুবরাজপুরের গৃহবধূ পর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় আক্ষেপের সুরে বলেন, পরিবারের বয়স্কদের ওষুধ থেকে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, সবকিছুর দাম এখন নাগালের বাইরে। গতবার বিজেপিকে ভোট দিয়ে আমরা যে কি ভুল করেছি তা এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি।
বিজেপি প্রার্থী অনুপকুমার সাহা অবশ্য এই বিক্ষোভকে তৃণমূলের সাজানো নাটক বলে এড়িয়ে যেতে চাইছেন। তিনি বলেন, তৃণমূল সরকার এলাকায় কোনো উন্নয়ন করেনি, বরং নেতাদের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু বিজেপির এই পাল্টা যুক্তি সাধারণ মানুষের খালি পকেটের যন্ত্রণাকে উপশম করতে পারছে না। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগে জর্জরিত বিজেপি প্রার্থীরা এখন বীরভূমের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে আক্ষরিক অর্থেই এক কঠিন ‘সাঁড়াশি চাপে’র মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইভিএমে এর প্রতিফলন কী হবে তা অবশ্য সময় বলবে।