নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: ‘একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর’। নির্বাচনের মরশুমে সিঙ্গুরে গেলে এই প্রবাদের প্রভাব টের পাওয়া যায়। রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা থেকে জনমুখী প্রকল্পের জনপ্রিয়তা এমনিতেই বিরোধীদের চাপে রেখেছে। তার উপরে সিঙ্গুরে তৃণমূলের হাতে আছে ধারালো সংগঠন। ডানপন্থী দল এবং সংগঠন, ‘সোনার পাথরবাটি’ হলেও সিঙ্গুরে কঠিন বাস্তব। মজা হচ্ছে, বাম-বিজেপির মতো ক্যাডার নির্ভর দলের সংগঠন সিঙ্গুরে নড়বড়ে। সিঙ্গুরের মাটিতে তাই তাদের ভরসা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা।
এই উলটপুরাণের সৌজন্যেই সিঙ্গুরে নির্বাচনি লড়াই ভিন্ন গোত্রের। পরীক্ষার হলে চেনা প্রশ্ন না পেলে শিক্ষার্থীদের যেমন বিভ্রান্ত দেখায়, বিরোধীদের অবস্থাও তাই। সরকারি সাফল্যের খতিয়ানের সঙ্গে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি তাদের জন্য গোদের উপরে বিষফোঁড়া। তৃণমূল প্রার্থী বেচারাম মান্নার নিবিড় সংগঠনই নয়, আছে নিজস্ব কায়দার জনসংযোগ। আর আছে অভিজ্ঞতা। সেই অমোঘ অস্ত্র যা জটিল পরিস্থিতিতেও সাফল্য এনে দেয়। সিঙ্গুরে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রার্থী হয়েছেন তিনি। তিনবারের বিধায়ক। সিপিএম প্রার্থী দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় তরুণ তুর্কি নেতা। কিন্তু প্রথমবার বিধানসভার মতো হাই-ভোল্টেজ নির্বাচনে নেমেছেন। তাঁর তবুও মাঠে-ময়দানে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। অন্যদিকে, বিজেপি প্রার্থী চিকিৎসক নেতা অরূপকুমার দাসের মেঠো রাজনীতির কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তিনি অর্থোপেডিক সার্জন। রাজনৈতিক মহলের দাবি, জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগে সংগঠনের ‘হাড়গোড়’ সুসজ্জিত করাই তাঁর মূল কাজ হয়ে উঠেছে। নাড়ি টিপে রোগ ধরার ভঙ্গিমায় তুড়ি দিচ্ছেন অরূপবাবু। বলেন, সিঙ্গুরের মানুষ ধারাবাহিকভাবে বঞ্চিত। বামেরা গুলি-বোমা খাইয়েছে, আর তৃণমূল দিয়েছে গুল-গল্প। তাই এবার পদ্ম ফুটবে।
ভোট ময়দানে নবাগত হলেও বেশ কইয়ে বলিয়ে নেতা দেবাশিস। তিনি মৃদু হেসে বলেন, গুলি তো খাওয়াচ্ছে বিজেপিই। ধর্ম-আফিমের গুলি। তৃণমূলও তাই। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-কর্মসংস্থান— সর্বহারাদের কথা উপেক্ষিত। সর্বহারা বিষয়টি অবশ্য নিজের জীবন দিয়েই বোঝেন বেচারাম। আপাত গো-বেচারা, পায়ের জুতো আর গ্রহরত্ন ছাড়া সবেতেই মেঠো ছাপ স্থায়ী হয়ে আছে। তিনি বলছেন, গোলা-গুলি নয়, উন্নয়নে আছি। মানুষ ভালোবাসা দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁদের কাছে ফের একবার কাজের সুযোগ চাইতে যাচ্ছি। প্রতিদিন ৩০-৪০ ঘুরছি। বাড়ি বাড়ি যাচ্ছি। আচমকা একটু ভাবুক হয়ে পড়েন নেতা। মৃদুস্বরে বলেন, একদিন সিঙ্গুর মডেল বিধানসভা কেন্দ্র হবে। সেটাই আমার স্বপ্ন। স্বপ্ন শব্দটা খুবই সার্থক সিঙ্গুরের জন্য। কৃষকের স্বপ্নপূরণের ভূমি, ঐতিহাসিক সিঙ্গুর আন্দোলন আজও সতেজ-সবুজ। সেদিন ভরপুর আবেগ ছিল। সেখান থেকেই তৃণমূল শিখেছে বেঁধে বেঁধে থাকার বাস্তবতা। সেই বন্ধনের আধুনিক নাম, নিবিড় সংগঠন। আপাত অদৃশ্য কিন্তু বজ্রকঠিন সাংগঠনিক ঘেরাটোপে সিঙ্গুর তাই ঘাসফুলের নিরাপদ দুর্গ। ‘কুলোর বাতাস’ তাতে দোলাও দিতে পারে না। জানে বিরোধীরাও।