অর্ক দে, কলকাতা: একসময়ের বামদুর্গ ছিল এন্টালির। পালাবদলের পর দীর্ঘ ১৫ বছর তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। মাঠপুকুর সংলগ্ন বাইপাস, তপসিয়া, দুর্গাপুর, হাতিবাগান, বিবিরবাগান, তিলজলা, পার্ক সার্কাস, সিআইটি রোড, এন্টালি নিয়ে এন্টালি বিধানসভা কেন্দ্র। এখানে ওয়ার্ডের সংখ্যা পাঁচটি-৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮ ও ৫৯। বাম জমানায় এখান থেকে জয়ী হতেন রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ হাসিম আব্দুল হালিম। তারপর থেকে টানা দেবেশ দাস। ছন্দপতন ঘটল ২০১১ সালে। লাল ছেড়ে সবুজ হয়েছে গোটা এলাকা। পরপর তিনবার ভোটে জয়ী হয়েছেন বর্তমান বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহা। এবার বাবার পরিষদীয় রাজনীতির আঙিনায় ভাগ্য পরীক্ষায় হাজির হয়েছেন ছেলে, এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সন্দীপন সাহা। বিপরীতে বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম। কংগ্রেস ও সিপিএম-দুই বিরোধী দলও সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েছে এই কেন্দ্রে। ফলে, ভোটা কাটাকাটির আশঙ্কা থেকেই যায় বলে মত রাজনৈতিক মহলের।
এন্টালি বাজারের দোকানদার থেকে ক্রেতা, স্থানীয় বাসিন্দারা সকলেই কমবেশি মানছেন কাজ হয়েছে যথেষ্ট। ‘বিধায়ক এলাকার সময় দেন। এলাকায় জলের সমস্যার সমাধান হয়েছে।’ বলছিলেন এন্টালি মার্কেট সংলগ্ন এক গ্যারাজের মালিক শাকিল খান। গিরিশচন্দ্র ঘোষ রোডে বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে বই পড়ছিলেন মধ্যবয়স্কা ভারতী মজুমদার। জিজ্ঞাসা করাতে বললেন, ‘দেখুন, কাজ হয়নি বললে মিথ্যা বলা হবে। তাছাড়া, স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড পেয়েছি। বার্ধক্য ভাতাও পাই। বদলের কোনো প্রয়োজন দেখছি না। তবে, পানীয় জলের জোগান আগের তুলনায় ভালো হলেও এখনও পর্যপ্ত নয়।’
ট্যাংরা, মাঠপুকুর, ধাপায় একের পর এক বস্তি অঞ্চল। বিক্ষিপ্তভাবে সেখানেও গজিয়ে উঠেছে বহুতল। নামে বস্তি হলেও চেহারায় অনেক বদল এসেছে। পুরানো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর নেই। ঘটনাচক্রে এই অঞ্চল সন্দীপনের নিজের ওয়ার্ড। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ‘এলাকার চেহারা পালটেছে। রাস্তাঘাটের হাল ফিরেছে। তৃণমূল প্রার্থী কাউন্সিলার হিসেবে যথেষ্ট কাজও করেছেন।’ এই অঞ্চলের মানুষের এই মনোভাব অনেকটাই স্বস্তি দিচ্ছে জোড়াফুল শিবিরকে। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই বিধানসভায় ৫৮ হাজারে জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু, সেই কেন্দ্রেই এবার ২ লক্ষ ৪০ হাজার ভোটার সংখ্যা এসআইআরের জেরে ১ লক্ষ ৮৪ হাজারে নেমে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই জয়ের অঙ্ক, ব্যবধান নিয়ে জলঘোলা রয়েছেই। কিন্তু সেই সব অঙ্ক পিছনে ফেলে মার্জিন বাড়ানোর লক্ষ্যই সন্দীপনের। অন্যদিকে, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়াল। ২০১৫ সালে পুর নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০২১ সালেও বিধায়ক পদপ্রার্থী ছিলেন। এবারও এন্টালিতে ভোটের ময়দানে প্রিয়াঙ্কা। স্থানীয় অঞ্চলের গুন্ডারাজ, তোলাবাজি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে ভোট ময়দানে তিনি। প্রিয়াঙ্কার অভিযোগ, এই অঞ্চলে টাকা না দিলে বিল্ডিংয়ের কাজ করা যায় না। এইসব টাকা স্থানীয় গুন্ডারা সংগ্রহ করে পুরোটাই বিধায়কের পকেটে ঢোকে। সেই দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই। অতঃপর, প্রত্যয়ী প্রিয়াঙ্কা।
দিবা স্বপ্ন দেখছে গেরুয়া শিবির, বলছেন সন্দীপন। সেই সঙ্গে নস্যাৎ করে দিয়েছেন প্রিয়াঙ্কার যাবতীয় অভিযোগ। তাঁর কথায়, ‘প্রমাণ ছাড়া মিথ্যা প্রচার করে চলেছেন বিজেপি প্রার্থী। আগের নির্বাচনে গোহারা হওয়ার পর ওঁর মুখ দেখতে পাননি এলাকার মানুষ। তৃণমূল কী কাজ করেছে, তা এখানকার সকলেই জানেন। ওঁকে তো বিজেপি কর্মীরাই পছন্দ করছেন না।’ তবে এসআইআরে বিপুল ভোটার কাটা গিয়েছে মধ্য কলকাতায় এই কেন্দ্রে। বিশেষ করে বহু সংখ্যালঘু মানুষের ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে। তার মধ্যে আবার বাম ও কংগ্রেস পৃথকভাবে সংখ্যালঘুকেই ‘মুখ’ করেছে। সেক্ষেত্রে তৃণমূলের একছত্র ভোটব্যাংকে থাবা বসানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেই মত রাজনৈতিক মহলের।
এন্টালির ভোট-মেরুকরণের অঙ্ক মেনে সিপিএম প্রার্থী হয়েছেন আব্দুল রউফ ও কংগ্রেসের প্রার্থী কাসিফ রেজা। আব্দুল রউফ বলছেন, ‘তৃণমূল সংখ্যালঘু মানুষকে শুধু ভোটব্যাংক হিসাবেই ব্যবহার করেছে। দুর্গাপুর, মাঠপুকুর, তিলজলা, বিবিরবাগান বিভিন্ন এলাকার উন্নয়নের লেশমাত্র নেই। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং পানীয় জল-এই বিষয়গুলিকে মানুষের সামনে তুলে ধরছি।’ তবে, প্রতিপক্ষ দুই সংখ্যালঘু নেতা কোনো ফ্যাক্টর’ হবেন না বলেই দাবি তৃণমূল প্রার্থীর। সন্দীপনের কথায়, ‘কে কাকে প্রার্থী করল, সেটা বড়ো কথা নয়। কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী, বড়ো কথা সেটাই। কোনো ভোট কাটাকাটি হবে না। সব ভোট বিজেপির বিরুদ্ধে এবং তৃণমূলেই পড়বে।’