• পদ্মপার্টির ধাপ্পায় বিদ্রোহের আগুন উদ্বাস্তু-মতুয়া শিবিরে, ইভিএমে জবাব দিতে মরিয়া হাবড়া
    বর্তমান | ০৬ এপ্রিল ২০২৬
  • দেবাঞ্জন দাস ও শ্যামলেন্দু গোস্বামী, হাবড়া: দেশভাগের সময় থেকে চলছে সেই ধারা! প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ থেকে আসা ছিন্নমূল হিন্দু উদ্বাস্তু মানুষকে দু’হাতে আগলে আশ্রয় দিয়েছে যে জনপদ, তার নাম হাবড়া। নোয়াখালি, বরিশাল, পাবনা, খুলনা, কুষ্ঠিয়া... পড়শি দেশের টুকরো কোলাজ আজকের উত্তর ২৪ পরগনার এই এলাকা। ‘হাবড়’ মানে নীচু জলাজমি, কালক্রমে যা হাবড়া। যদিও স্প্যানিশ ভাষায় ‘হাবড়া’র অর্থ ‘ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা’। জয়গাছি মাঠপাড়ার বৃদ্ধ মতুয়া দলপতি সুরেশচন্দ্র বৈদ্য সরকার ভাগ্যিস স্প্যানিশ ভাষা জানেন না! কারণ, তাঁর মতো ৪০ বছর আগে বরিশাল থেকে এসে হাবড়ায় ‘ডেরা’ বাঁধা অনেকেরই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা আজ প্রশ্নের মুখে। সৌজন্যে জ্ঞানেশ কুমারের নির্বাচন কমিশন। এসআইআরের ধাক্কায় সুরেশবাবু সহ হাজার হাজার মানুষ আজ পরিবার সমেত ‘বেনাগরিক’! কয়েক বছর ধরে পদ্মপার্টির নাগাড়ে প্রতিশ্রুতি আর মতুয়া সংঘাধিপতির আশ্বাস সত্ত্বেও জোটেনি ভারতীয় নাগরিকত্ব। এখন আবার ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ! একূল-ওকূল দুই-ই গিয়েছে সুরেশবাবুদের। হাবড়া কি এখনও উদ্বাস্তু-মতুয়াদের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ? প্রশ্ন উঠেছে এবারের ভোটপর্বে।  

    একের পর এক উদ্বাস্তু কলোনি, চালের কারবার, শাঁখারিপট্টি, সোনার দোকান, জিভে জল আনা টক-মিষ্টি দই আর গ্রাম-শহর মেলানো জনপদের প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রাম—সব মিলিয়েই হাবড়া। রাস্তাঘাট, নিকাশি ব্যবস্থা, পানীয় জল, আলো... এর থেকে বেশি কিছু চান না এখানকার বাসিন্দারা। এহেন নিরীহ-নিপাট এই উদ্বাস্তুনগরীতে এবার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা যোগীরাজ্যের ‘বুলডোজার রাজনীতি’র কালো ছায়া। কেন এমন ধ্বংসের রাজনীতিকে নিয়ে আসা হচ্ছে শান্ত হাবড়ায়? প্রশ্ন তুললেন হাটথুবার মাস্টারমশাই জয়দেব রায়। কে আছে এর নেপথ্যে? সোজাসাপটা জবাব এল, ‘কে আবার, বিজেপি প্রার্থী দেবদাস মণ্ডল!’ রামনবমী পর্বে বুলডোজার চেপে জঙ্গলরাজ খতমের হুমকি দিয়েছেন তিনি। প্রতিপক্ষ তৃণমূল প্রার্থী জ্যোতিপ্রিয় (বালু) মল্লিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন জেল খাটিয়েও বালুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ কেন এখনও আদালতে পেশ করতে পারল না কেন্দ্রীয় এজেন্সি? এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না পদ্মপার্টির কেউই।

    আর শহরের ১৩৪টি এবং গ্রামীণ এলাকার ১২৭টি বুথ মিলিয়ে সাত হাজারের বেশি মানুষের নাম বাদ গিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। তাঁদের ভবিষ্যৎই বা কী হবে? বিজেপি প্রার্থীর জবাব সেখানেও ভাসা ভাসা, ‘প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা দিয়েছেন, সবার নাম উঠবে।’ কিন্তু কীভাবে? তারও জবাব নেই ‘পরিবর্তনপন্থী’দের কাছে। তৃণমূল প্রার্থী বালুর কথায়, হাবড়ায় এবার বুলডোজার বনাম উন্নয়নের রাজনীতির লড়াই!

    কেমন সেই লড়াই? টের পাওয়া গেল কৈপুকুরের গৃহবধূ অনিমা বৈদ্য কিংবা খড়ের মাঠের তরুণ পার্থ সরকারের সঙ্গে কথা বলে। রাজনীতির চর্চায় তাঁরা কেউই আগ্রহী নন। তবে ফি বছর বর্ষায় ডুবে থাকা হাবড়ায় পাম্পিং স্টেশন বসিয়ে মানুষের জল-যন্ত্রণা মুক্তির ব্যবস্থা করেছেন বালু, তা বিলক্ষণ জানেন। জানেন, কীভাবে নৈহাটির গঙ্গার জল পরিশোধন করে আবালসিদ্ধি হয়ে পাইপে হাবড়ায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হল... সেকথাও। জয়গাছি, হাটথুবা ঘোষপাড়া, পদ্মাপল্লি, বাহান্ন পরিবারের মতো উদ্বাস্তু-মতুয়া প্রভাবিত যে এলাকাগুলি এতদিন পদ্মপার্টির প্রতি চোখ বুজে আনুগত্য দেখিয়ে এসেছে, সেখানে এবার ‘বিদ্রোহে’র আঁচ। ‘বয়কট বিজেপি’ পোস্টার পড়েছে। উন্নয়ন নিয়ে বাড়তি কোনো আবদার এখানে নেই। বরং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, খাদ্যশ্রী মিলবে কি না, তা নিয়েই বেশি চিন্তায় ‘বেনাগরিক’রা।
  • Link to this news (বর্তমান)