১৫ জন সঙ্গী ও একজন নেচার গাইডকে নিয়ে কর্নাটকের তাদিয়ান্দামোল পাহাড়ে ট্রেক করতে গিয়েছিলেন কেরালার তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী জি এস শরণ্যা (৩৬)। ২ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। ওই দিন বিকেলে পাহাড় থেকে নামার সময়ে নিজের দলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান শারন্যা। এর পরে রুদ্ধশ্বাস চারটি দিন। রবিবার তাঁকে উদ্ধার করল বন দপ্তরের টিম।
সূত্রের খবর, কোকিঝোড়ের বাসিন্দা শরণ্যা কর্মস্থল থেকে লম্বা ছুটি নিয়ে ব্যাগপ্যাক সঙ্গে করে বেরিয়েছিলেন। তাদিয়ান্দামোল চূড়ায় উঠেও পড়েছিলেন সহযাত্রীদের সঙ্গে। ২ এপ্রিল নেমে আসার সময়ে বিপদ নেমে আসে। টিম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি। গহীন জঙ্গলে শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই।
শরণ্যা হয়তো ইয়োসি গিনসবার্গ-এর কথা জানেন না। যিনি আমাজনের জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ পর ফিরে আসতে পেরেছিলেন। শরণ্যা হয়তো শোনেননি, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর শঙ্করের কথাও। উদ্ধারের পরে শরণ্যা জানিয়েছেন, শুরুতে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন ঠিকই। তবে মনের জোর ছিল অটুট। তিনি বলেন, ‘নীচে নামার সময়ে আমি হঠাৎ করেই কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি বাঁ দিকের একটি পথে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানেও কাউকে খুঁজে পাইনি।’ যত সময় যেতে থাকে, জঙ্গলের আরও গভীরে পথহারা হয়ে যান শরণ্যা।
ও দিকে, মোবাইলের চার্জ কমছে। কিছুটা যাওয়ার পরে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। শরণ্যা জানান, তাঁর ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার আগে তিনি তার এক সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু লাভ হয়নি। ততক্ষণে শরীরের এনার্জিও ফুরিয়ে গিয়েছে। জঙ্গলের ভিতরেই একটি ছোট পাহাড়ি নদীর ধারে সেই রাত কাটান। পরের দিন সকাল থেকে ফের রাস্তা খোঁজা শুরু। প্রথম দিনে বেশি হাঁটাহাঁটির জন্য পায়ে ব্যথা শুরু হয়। ৩ এপ্রিল জঙ্গলের মধ্যেই বিশ্রাম নিয়েই সময় কেটে যায়। দ্বিতীয় দিন জঙ্গলের রাস্তা ধরে আরও কিছুটা এগিয়ে তুলনামূলক খোলা জায়গায় অনেকটা সময় কাটান। আন্দাজ করে নিয়েছিলেন, তাঁর নিখোঁজ হওয়ার খবরে বন দপ্তর এতক্ষণে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। আকাশ থেকে ড্রোন যাতে তাঁকে দেখতে পায়, সেই চেষ্টায় বেশিরভাগ সময় খোলা জায়গায় সময় কাটান।
তৃতীয় দিন পাহাড়ের আরও কিছুটা উপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু বাধ সাধে প্রবল বৃষ্টি। ভিজে, স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় ‘সারভাইভ’ করার লড়াইটা ক্রমশ কঠিন হতে থাকে। কখনও হেঁটেছেন, কখনও থেমেছেন, কখনও জোরে চিৎকার করেছেন। যাতে তাঁর গলার আওয়াজ কেউ শুনতে পান। রবিবার জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে আদিবাসীদের একটি গোষ্ঠীর বসতিতে হাজির হন শরণ্যা। উল্টোদিক থেকে উদ্ধারকারী দলও সেই জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল রবিবার। তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়।
‘জানি না কেন, তবে আমার কিন্তু খুব একটা ভয় লাগেনি’
কেরালার তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী জি এস শরণ্যা
বন বিভাগের কর্মী, পুলিশ, অ্যন্টি নকশাল স্কোয়াড এবং স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিয়ে মোট নয়টি সার্চ টিম গঠন করেছিল কর্নাটক সরকার। দিনরাত অবিরাম তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। শরণ্যার অবস্থান শনাক্ত করতে থার্মাল ড্রোন ক্যামেরাও ব্যবহার করা হয়েছিল। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী এই বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানানোর পর কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার নির্দেশে এই উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়।
কর্নাটকের বনমন্ত্রী এ খান্দ্রে বলেন, ‘একটি ৫০০ মিলিলিটারের একটি জলের বোতল সম্বল করে এবং কোনও মোবাইল নেটওয়ার্ক সংযোগ ছাড়াই তিনি চার দিন গভীর অরণ্যের ভেতর দিয়ে পথ চলেছেন। শরণ্যা খুবই সাহসী ও রোমাঞ্চপ্রিয়। তবে জঙ্গলের ভেতর মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল।’
চারদিনের এই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতায় কি কিছুটা ভীত শরণ্যা? সাংবাদিকদের হেসে উত্তর দিলেন, ‘জানি না কেন, তবে আমার কিন্তু খুব একটা ভয় লাগেনি।’