• নিষ্পত্তি হবে কত দিনে, ট্রাইব্যুনালকে সময় বাঁধল না শীর্ষ কোর্ট, প্রশ্নের মুখে ২৭ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ
    এই সময় | ০৭ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি: সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট থেকে যে ভোটারদের নাম ‘ডিলিটেড’ হয়েছে, তাঁরা অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে দ্বারস্থ হওয়ার জন্য অফলাইনে জেলাশাসকের দপ্তরে নথি জমা দিলে তার রসিদ দিতে হবে। এমনকী, আগে এমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ নথি যদি আবেদনকারী পেশ না–করতে পারেন, তা হলে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য সেই নথিও তিনি জমা দিতে পারবেন ট্রাইব্যুনালে— সোমবার বাংলার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) সংক্রান্ত মামলায় এমনই নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।

    অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের জন্য ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নাম সমেত বিজ্ঞপ্তি নির্বাচন কমিশন জারি করেছে, জোকায় ট্রাইব্যুনালের অফিসের জন্য জায়গাও চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু এ দিন পর্যন্ত সেই অফিস চালু হয়নি। শুধুমাত্র সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ট্রাইব্যুনালের সদস্য, কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম ‘ডিলিটেড’ দুই কংগ্রেস প্রার্থীর আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেছেন। এই অবস্থায় বাংলার প্রায় ৬০ লক্ষ ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ ভোটারের মধ্যে যাঁদের নাম ‘ডিলিটেড’ হয়েছে, তাঁদের এ বার ভোটাধিকার থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দু’দফায় ভোটে সংশ্লিষ্ট ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন কি না, তা স্পষ্ট হলো না সুপ্রিম কোর্টের এ দিনের শুনানিতেও। তবে সুপ্রিম কোর্টের কিছু নির্দেশে ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীরা কিছুটা ভরসা পাবেন বলে মনে করছেন অনেকে।

    রাজ্য সরকারের আইনজীবী কপিল সিবাল এ দিন শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে দাবি করেন, অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি করে ২৬ লক্ষ লোকের (যাঁদের নাম ডিলিটেড হচ্ছে) ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করা হোক৷ একই যুক্তি পেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তরফে প্রবীণ আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান৷ তাঁর সওয়াল, ‘অ্যাজুডিকেশন তালিকায় থাকা ৬০ লক্ষেরও বেশি মামলার নিষ্পত্তি করায় বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের প্রশংসা করতেই হয়। তথ্য অনুযায়ী, নাম অন্তর্ভুক্তির হার প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং নাম বাতিলের হার ৪৫ শতাংশ। নাম বাতিলের এই হার অত্যন্ত বেশি। ইতিমধ্যেই প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ অ্যাপিল করেছেন এবং আরও কয়েক লক্ষ আবেদন করার পথে।’ তিনি এও জানান, ট্রাইব্যুনালগুলি এখনও সম্পূর্ণ রূপে কাজ শুরু করেনি। নথি জমা করার জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ছে এবং ভোটাররা প্রচণ্ড সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

    দিওয়ানের প্রস্তাব ছিল, ১৫ এপ্রিলকে ‘কাট অফ ডেট’ চিহ্নিত করে তার মধ্যে সব অ্যাপিলের নিষ্পত্তি করুক ট্রাইবুনাল৷ ১৮ এপ্রিল রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার দাবিও জানান তিনি৷ এই যুক্তি খারিজ করেছে বেঞ্চ৷ এই বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ, ‘২৬ লাখ ভোটারের প্রত্যেকে চাইবেন তাঁর নাম যোগ করতে৷ ১৫ দিনের মধ্যে ২৬ লক্ষ লোকের নাম ক্লিয়ার করার নির্দেশ দিলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে৷’ কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার দাবি, ‘আবার বড় সমস্যা তৈরি হবে৷ এর ফলে নির্বাচনী বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত তারিখ পরিবর্তন করতে হতে পারে৷’ নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডিএস নাইডু যুক্তি দেন, আগের দিনের শুনানিতেই বিচারপতি বাগচী বলেছেন, এ বারের নির্বাচনে ভোটদান করতে না পারলেও আগামী দিনে তাঁদের নাম আবার তুলতে পারেন সংশ্লিষ্ট ভোটাররা৷

    অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা ব্যক্তিরা নিজেদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে মামলা করতে পারেন বলে জানান প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তাঁর কথায়, ‘সিভিল কোর্ট, ফার্স্ট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে যাবেন ক্ষতিগ্রস্তরা৷ আমরা আজই ম্যাটার শেষ করছি না৷ আগে দেখি ট্রাইব্যুনাল কী ভাবে কাজ করে৷’ আগামী সোমবার, ১৩ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। সেখানে ট্রাইব্যুনালে মীমাংসা হওয়া অ্যাপিলের গতিপ্রকৃতি খতিয়ে দেখবে আদালত৷ সিজেআই উল্লেখ করেন, মোট ৬০ লক্ষ ‘অ্যাজুডিকেশনে’র মধ্যে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ৫৯.১৫ লক্ষের নিষ্পত্তি করেছেন জুডিশিয়াল অফিসাররা। এ দিনই এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের পাঠানো তথ্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চিঠিতে জানানো হয়েছে যে মালদায় ঘেরাওয়ের মতো একাধিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ৮ লক্ষ আবেদনের সবক’টির নিষ্পত্তি করা হয়েছে।’

    এ দিনের শুনানিতে বারবারই রাজ্য সরকারের আইনজীবীরা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া রাজ্যবাসীর ভোটাধিকারের সুরক্ষার দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করেন৷ এই সওয়ালে মান্যতা দেয়নি শীর্ষ আদালত৷ বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালগুলি তাদের শুনানি চালিয়ে যাবে এবং আমরা তা তাড়াহুড়ো করে শেষ করতে চাই না। তবে তালিকাটা তো কোথাও গিয়ে চূড়ান্ত করতে হবে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের দ্বারা এক ধাপের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। অ্যাপিল প্রক্রিয়ায় আরও এক বা দু’মাস সময় লাগতে পারে ঠিকই, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কাজ ফেলে রাখতে হবে।’

    ১৯টি ট্রাইব্যুনালের মাথায় প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতিরা রয়েছেন, তাই বিষয়টি তাঁদের উপরেই ছাড়তে চেয়েছে আদালত। এই ট্রাইব্যুনালগুলি অ্যাপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যাতে একটি অভিন্ন কার্যপ্রণালী মেনে চলে, তার জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে এই মর্মে তিন জন প্রাক্তন বর্ষীয়ান প্রধান বিচারপতি বা বিচারপতিকে নিয়ে একটি কমিটি গঠনের অনুরোধ করা হয়েছে। এই কমিটি আগামিকালের (মঙ্গলবার) মধ্যেই কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করবে, যা ১৯টি ট্রাইব্যুনালকে বাধ্যতামূলক ভাবে মেনে চলতে হবে। ওই কমিটি আরও সিদ্ধান্ত নেবে, সব অ্যাপিল কি শুধুমাত্র কলকাতাতেই দাখিল করতে হবে, না কি অন্য জায়গাতেও তা করা যাবে। প্রধান বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে আরও জানান, কোনও ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জানানোর সময়ে অফ লাইনে তাঁর আবেদন জমা দিলে জেলাশাসকের দপ্তর থেকে রসিদ দিতে হবে। ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়া কোনও ব্যক্তির ভোটাধিকারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নতুন নথি বিবেচনা করা যাবে৷ সিজেআই কান্তের পর্যবেক্ষণ, ‘ট্রাইব্যুনাল নতুন নথি দেখতে পারে। কেউ যদি মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট জমা দেন এবং এর আগে তা বিবেচনা করা না হয়ে থাকে, তা হলে ট্রাইব্যুনাল সেটি যাচাই করে দেখতে পারে ৷’

    এ দিনের সুপ্রিম শুনানিতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নাতি ও নাত বৌয়ের নাম বাদ যাওয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়৷ সিজেআই জানান, কমিশনকে নন্দলাল বসুর নাতি ও নাত বৌয়ের করা অ্যাপিলে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। শুনানির শেষ লগ্নে কমিশনকে খোঁচা দিয়ে ‘এক্সক্লুশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া’ বলে কটাক্ষ করেন আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পাল্টা নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডিএস. নাইডু বলেন, ‘আপনাকে নিয়ে যত কম কথা বলা যায়, ততই ভালো।’

  • Link to this news (এই সময়)