এই সময়, নয়াদিল্লি: ‘আপনাদের জন্যই রাজ্য প্রশাসনের এই হাল’— মালদার মোথাবাড়িতে গত সপ্তাহে ‘সার’–এর কাজে যুক্ত বিচারকদের আটকে বেনজির বিক্ষোভের ঘটনায় এ ভাবেই রাজ্যের মুখ্যসচিব ও ডিজিপিকে ভর্ৎসনা করল সুপ্রিম কোর্ট। বাংলার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) সংক্রান্ত মামলার শুনানি সোমবার নির্ধারিত ছিল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চে। সেখানে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট বা ট্রাইব্যুনাল গঠনের পাশাপাশি গত বৃহস্পতিবারই শীর্ষ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে যুক্ত করেছিল মোথাবাড়িতে বিচারক বা জুডিশিয়াল অফিসারদের হেনস্থার প্রসঙ্গটি। ওই ঘটনায় রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা, ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা এবং মালদার জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে শো–কজ় করেছিল শীর্ষ আদালত। ওই চারজনকেই এ দিন ভার্চুয়াল শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়েছিল। এ দিন শুনানি চলাকালীন সুপ্রিম কোর্ট মুখ্যসচিব ও ডিজিপি— দু’জনকেই তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। তাঁদের উদ্দেশ করে আদালত এ দিন ফের বলে, ‘এটা রাজ্য প্রশাসনের চরম গাফিলতির পরিচায়ক।’
এ দিনের শুনানিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উদ্দেশে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা কিছু মন্তব্য নিয়েও অভিযোগ করেন কমিশনের আইনজীবী। কমিশন আরও জানায়, এই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য পরিবেশকে আরও খারাপ করে দেবে। কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের রেকর্ডিং আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে কমিশন। সিজেআই কান্ত বলেন, ‘যদি রাজ্যের প্রশাসন ব্যর্থ হয়, তবে কী করতে হবে তা বিবেচনা করবে আদালত।’
সুপ্রিম কোর্টের আগের দিনের নির্দেশের পরে মোথাবাড়ির ঘটনার তদন্তভার এনআইএ–র হাতে তুলে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। এ দিন এনআইএ–র আইজি সনিয়া সিং দিল্লিতে যান সেই সংক্রান্ত প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিতে। সিজেআই সূর্য কান্ত জানান, এনআইএ প্রাথমিক স্টেটাস রিপোর্ট জমা দিয়েছে সিলড খামে, যাতে রাজ্য পুলিশের কয়েকজনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে৷ আদালতের নির্দেশ, ওই ঘটনায় রাজ্য পুলিশের দায়ের করা ১২টি এফআইআরের নথি দ্রুত কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে হস্তান্তর করতে হবে এবং তদন্তে সর্বপ্রকার সহযোগিতা করতে হবে৷ প্রয়োজন মনে করলে এনআইএ নতুন মামলা দায়ের করতে পারবে৷ সুপ্রিম কোর্ট এ দিন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালকে অনুরোধ করে, গোটা বিষয়টি তদারকি করতে। সেখানেই এনআইএ রিপোর্ট দিতে থাকবে৷ আগের দিনের মতো সোমবারও সুপ্রিম কোর্ট জানায়, গোটা ঘটনাটি অত্যন্ত পরিকল্পনামাফিক ঘটানো হয়েছিল। এ দিন এনআইএ–র প্রাথমিক রিপোর্টে রাজ্য পুলিশের কয়েকজনের নাম থাকার বিষয়টি সেই দিকেই আরও জোরালো ভাবে ইঙ্গিত করছে বলে মত প্রশাসনিক মহলের একাংশের।
এ দিনের শুনানিতে মোথাবাড়ির ঘটনায় আইন–শৃঙ্খলার চরম অবনতি নিয়ে শীর্ষ আদালতের নিশানায় ছিলেন বিশেষ করে মুখ্যসচিব নারিয়ালা। ঘটনাচক্রে রাজ্য ও জেলার পুলিশ–প্রশাসনের এই চার কর্তাকেই দায়িত্বে বসিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। যদিও আদালত সে বিষয়টিতে নয়, গুরুত্ব দিয়েছে মোথাবাড়ির ঘটনায় পুলিশ–প্রশাসন কী ভাবে রিঅ্যাক্ট করেছে তার উপরে। গত বৃহস্পতিবারের শুনানির দিনই আদালত জানিয়েছিল, এতবড় ঘটনার পরেও মুখ্যসচিবকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা যায়নি। এ দিন সেই প্রসঙ্গ তুলে সিজেআই সূর্য কান্ত মুখ্যসচিবের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার কী সমস্যা হয়েছিল যে আপনি হাইকোর্টের চিফ জাস্টিসের ফোন পর্যন্ত ধরেননি!’ নারিয়ালা যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন, ‘সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি কোনও ফোন পাইনি৷ আমি সে দিন দিল্লিতে এসেছিলাম, কলকাতায় ফিরেছিলাম সন্ধ্যায়৷’ বিচারপতি বাগচী তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মিঃ চিফ সেক্রেটারি, আপনি কলকাতায় ফেরার পরে ফোন করা হয়েছিল৷ আপনি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর শেয়ার করেননি৷ দয়া করে নিজেকে একটু নীচে নামান৷ নিজেকে এতটা উচ্চতায় তুলবেন না৷ এমন জায়গায় অন্তত নামান নিজেকে, যেখানে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন৷’ নারিয়ালা ও তাঁর পাশে বসে থাকা সিদ্ধিনাথকে উদ্দেশ করে সিজেআইয়ের স্পষ্ট কথা, ‘আপনাদের দু’জনের ব্যর্থতার জেরেই পশ্চিমবঙ্গে এমন সমস্যা হয়েছে৷ আপনারা রাজ্য প্রশাসনে এমন রাজনীতি করেন? আপনাদের জন্য রাজ্য প্রশাসনের এই হাল৷ আমরা রাজ্যের বিরুদ্ধে অর্ডার জারি করতে চাই না৷ তারপরেও আপনারা আমাদের বাধ্য করেন৷’
রাজ্যের হয়ে প্রবীণ কৌঁসুলি সিদ্ধার্থ লুথরা কিছু বলার চেষ্টা করলে তাঁকে থামিয়ে সিজেআই কান্ত বলেন, ‘আপনি দয়া করে এঁদের ডিফেন্ড করবেন না৷ এঁদের প্যাম্পারও করবেন না৷ আপনারা কলকাতা হাইকোর্টের চিফ জাস্টিসের কাছে ক্ষমা চান৷ (এত ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে) রাত সাড়ে ১১টায় ডিজিপি যাচ্ছেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে যোগাযোগ করতে!’ বিচারপতি বাগচীও বলেন, ‘মালদার জেলাশাসক ও পুলিশ সুপার কিছুই করেননি, ওঁরা দর্শক ছিলেন৷’ কেন এসপি নিজে গভীর রাত পর্যন্ত ঘটনাস্থলে যাননি, এ দিন ফের সে প্রসঙ্গ ওঠে।
এ দিন কেন্দ্রের তরফে অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল এসভি রাজু বলেন, ‘আগেই তিনটি এফআইআর করা হয়েছে, নটি অ্যাডেড এফআইআর৷ মহিলা জুডিশিয়াল অফিসারকে পর্যন্ত আটকে রাখা হয়েছিল।’ এমনকী এনআইএ অফিসাররা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। রাজু বলেন, ‘মোট ২৪ জনকে এখনও গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ ৪৩২ জনের কল ডিটেলস রেকর্ড অ্যানালাইজ় করা হচ্ছে৷’ তাঁর সংযোজন, ‘সমস্যা হচ্ছে, প্রাথমিক তদন্ত করেছিল স্থানীয় পুলিশ। আদালত লোকাল পুলিশকে নির্দেশ দিক, যাতে আমাদের সব নথি হস্তান্তর করা হয়।’ মোথাবাড়ির ঘটনায় যে মহিলা বিচারকের ভিডিয়ো ক্লিপ ভাইরাল (যার সত্যতা ‘এই সময়’ যাচাই করেনি) হয়েছিল, সেটিও এ দিন ট্যাবে শোনানো হয়। এ নিয়েও কেন্দ্র ও কমিশনের আইনজীবীদের সঙ্গে রাজ্যের কৌঁসুলিদের তর্কাতর্কি বেধে যায়। কমিশনের আইনজীবী ডি শেষাদ্রি নাইডুর অভিযোগ, এর আগে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী প্ররোচনামূলক মন্তব্য করেছেন। জনতার উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘উত্তরপ্রদেশ থেকে সিআরপিএফ আসছে আপনাদের মারতে।’
পাল্টা রাজ্যের রাজ্যের তরফে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, ‘তা হলে প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন, সেই ভিডিয়ো আমাদের দেখাতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁকে খুন করা হতে পারে বলে।’ দু’পক্ষের সওয়াল জবাবের মাঝে সিজেআই সূর্য কান্ত বলেন, ‘রাজ্য প্রশাসন ব্যর্থ হলে আমরা দেখব কী করা যায়৷’ এ দিনের শুনানিতে ভোট পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গও উঠে আসে। আইনজীবী ভি গিরি বলেন, ‘আমরা ২০২১–এর ভোট পরবর্তী হিংসাত্মক ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না৷ আমার মনে হয় রাজ্য সরকারও চায় না৷ নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য সরকার এই ঘটনাগুলি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করুক।’ সিজেআই জানান, রাজ্য এবং নির্বাচন কমিশন উভয়েই হলফনামা দিয়ে তাদের অবস্থান জানাবে৷