এই সময়: আদালতের নির্দেশ কার্যত স্তম্ভিত করে দিয়েছিল শান্তিনিকেতনকে। শুধু শান্তিনিকেতনই বা কেন, ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলা বন্ধের নির্দেশে অনেকেই মর্মাহত হয়েছিলেন। কিন্তু মেলার কারণে পরিবেশ যে ভাবে দূষিত হয়, তা ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় হাইকোর্ট মেলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। এখন পৌষমেলা ফের শুরু হলেও, আর একটি বিষয় নজরে এসেছে—বিশ্বভারতীর বেহাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে।
বিশ্বভারতীর নিজস্ব এলাকার মধ্যে অন্তত ২০ হাজার মানুষের বাস। হস্টেল, কোয়ার্টার্স থেকে শুরু করে অফিস-কাছারি, হাসপাতাল, পর্যটক নিয়ে আরও অনেকের আনাগোনা। কিন্তু সেখানে কোনও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই নেই। বিষয়টি নিয়ে মামলা করেছিলেন পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত। সেই মামলায় জাতীয় পরিবেশ আদালত (এনজিটি)-এর পূর্বাঞ্চলীয় বেঞ্চ সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তৈরি-সহ বেশ কিছু নির্দেশ দিয়েছিল। কী কী কাজ হয়েছে, তা হলফনামার আকারে তলব করেছিল এনজিটি। কিন্তু হলফনামায় জানা গেল, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিশ্বভারতী শুধু কেন্দ্রের কাছে টাকা চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে মাত্র।
বিশ্বভারতী চত্বরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বর্জ্য অপসারণের কোনও পরিকাঠামোই গড়ে ওঠেনি। ভুবনডাঙার বাঁধের মতো জলাশয়গুলি নর্দমার জলে বিষাক্ত। সুভাষের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের ২০২৩-এর নির্দেশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সমস্ত কাজ শেষ করার কথা ছিল। সেই নির্দেশ পালন না হওয়ায় আদালত বীরভূমের জেলাশাসককে দশ হাজার টাকা জরিমানাও করেছে। এখন চাপের মুখে পড়ে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ বোলপুর পুরসভার সঙ্গে একটি সমঝোতাপত্র (এমওইউ বা মৌ) স্বাক্ষর করেছেন। পাশাপাশি, আইআইটি খড়্গপুরকে দিয়ে নিকাশি ব্যবস্থার নীল নকশা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।
স্থির হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই বর্জ্য সংগ্রহ করবে এবং পুরসভার প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটে তা পাঠাবে। এ জন্য মাসে ৬০ হাজার টাকা দেবে। এদিকে বোলপুর পুরসভাকে বাড়ি বাড়ি বর্জ্য সংগ্রহের ‘ইউজ়ার ফি’ মেটানোর জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ১৫ লক্ষ টাকা এবং ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ১.৫ কোটি টাকা বিশেষ অনুদান প্রয়োজন বিশ্বভারতীর। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে অত্যাধুনিক সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তৈরির জন্য প্রায় ১৩ কোটি টাকা দরকার। এই টাকা চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৬–এর ১৯ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রকের উচ্চশিক্ষা বিভাগকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে, এত দিনে কেন ঘুম ভাঙল বিশ্বভারতীর? এই চিঠি আরও আগে কেন পাঠানো হয়নি?
সুভাষের বক্তব্য, ‘বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে কার্যত দূষণকে বরণ করে নিয়েছেন।’ পরিবেশবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে পরিকাঠামো উন্নয়নের কোনও সদিচ্ছা না দেখিয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে দিল্লির দিকে তাকিয়ে থাকা আসলে সময় নষ্টেরই নামান্তর।