শিলাদিত্য সাহা
বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী রুখবে কে?
কুমির, কেউটে... আবার কে!
আসন্ন বিধানসভা ভোটে কোনও রাজনৈতিক দলের স্লোগান বলে ভাবছেন? নাহ। বরং স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথমবার সীমান্ত রক্ষার জন্য প্রকৃতির শরণাপন্ন হয়েছে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সমরাস্ত্রের বাইরে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কী ভাবে অনুপ্রবেশ রোখা যায়, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে আপাতত সেই উপায় বের করতে ব্যস্ত তারা।
‘সার’ আবহে বঙ্গের আসন্ন বিধানসভা ভোটে শাসক–বিরোধী দু’পক্ষেরই তরজা জারি ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে। পড়শি বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে বহু অনুপ্রবেশকারী পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেছে এবং বেআইনি পথে নথি বানিয়ে ভোটার হিসেবে ভারতে বাস করছে — এ অভিযোগ উঠছে অহরহ। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে। অথচ দুই বাংলার মধ্যে ২,২১৭ কিমি বিস্তৃত সীমান্তের অনেকটা অংশে এখনও কাঁটাতারের বেড়া নেই। তা হলে অনুপ্রবেশ রোখার উপায় কী?
এখানেই আলোচনায় আসছে এমন এক পন্থার প্রস্তাব, যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ড্রোনে নজরদারির যুগে রীতিমতো ‘প্রাগৈতিহাসিক’। কিন্তু কাজে এলে সেটাই হয়ে উঠতে পারে অন্যতম বর্ম। দেশের বর্ডার সিকিওরিটি ফোর্স (বিএসএফ) সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত ২০ মার্চ দিল্লিতে তাদের সদর দপ্তরে ডিরেক্টর জেনারেল–সহ শীর্ষ আধিকারিকদের একটি আলোচনা হয়, যেখানে অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি ও সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ জোর দিতে বলা হয়েছে। বর্ডারে নজরদারির বাইরে থাকা জলাশয় এবং জলাভূমি এলাকায় রেপ্টাইল (সরীসৃপ) প্রজাতির প্রাণীদের ছেড়ে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক বর্ম গড়ে তোলা যায় কি না, তা দেখতে বলা হয়েছে বিএসএফকে। বাবুরাম সাপুড়ের কাছে যেমন ফোঁসফোঁস না করা দুধভাত খাওয়া নিরীহ সাপের আব্দার করা হয়েছিল, তেমন নয়। বরং এখানে দরকার তেজি সরীসৃপ, যার ‘এক ছোবলেই ছবি’ হবে অনুপ্রবেশকারী!
বিএসএফ সূত্রে জানা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের পূর্বদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে ২,২১৭ কিমি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সীমান্তের অন্তত ৫৬৯ কিমি এলাকায় কোনও কাঁটাতার নেই। কাঁটাতার বসানো এবং বর্ডার আউটপোস্ট তৈরির জমি পাওয়া নিয়ে কেন্দ্র–রাজ্য বিবাদও জারি রয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। কিন্তু জমির পাশাপাশি কেন্দ্রের চিন্তা, যে ৫৬৯ কিমিতে কাঁটাতার নেই, তার মধ্যে আবার প্রায় ১১৩ কিমি এলাকায় কাঁটাতার বসানো সম্ভবই নয়। বর্ডার আউটপোস্ট না–থাকায় এমনিতেও সেখানে নজরদারির সুযোগ নেই বললেই চলে। সমস্যা মোবাইল নেটওয়ার্কেরও। তাই ভরসা এখন সরীসৃপ!
সূত্রের দাবি, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে বিএসএফের শীর্ষ আধিকারিকদের বলা হয়েছে, নজরদারি কম থাকা সীমান্ত এলাকায় (ভালনারেবল রিভারিন গ্যাপ) নদী–খাল–বিলের মতো জলাশয় এবং জলাভূমি (মার্শি টেরেইন) এলাকায় বেশি করে কুমির এবং সাপ ছাড়া যায় কি না, তা তাড়াতাড়ি খতিয়ে দেখতে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, যেখানে বন্দুক বা অত্যাধুনিক সার্ভেল্যান্স সিস্টেম পুরোমাত্রায় সক্রিয় হতে পারছে না, সেখানে প্রকৃতিই বর্ম হয়ে উঠবে ভারতীয় সীমান্তের। বিএসএফ–এর চোখ এড়িয়ে কেউ যদি জলপথে ভারতে ঢোকার কথা ভাবে, তা হলে তাকে হিংস্র কুমির বা বিষধর সাপের মুখোমুখি হতে হবে। এই পন্থায় শুধু অনুপ্রবেশ নয়, নদীপথে চোরাচালানেও রাশ টানা যাবে বলে মনে করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। তাই বিএসএফ–কে বলা হয়েছে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের (অপারেশনাল পারস্পেকটিভ) সব দিক খতিয়ে দেখতে।
পাশাপাশি আরও দু’টি বিষয়ে নজর দেবে বিএসএফ। প্রথমত, ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের কোন কোন বর্ডার আউটপোস্ট ‘ডার্ক জ়োন’–এ পড়ছে, তা খুঁজে বের করবে তারা। এইসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অত্যন্ত দুর্বল, যা উন্নত করা হবে। দ্বিতীয়ত, সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোয় যাঁদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা দায়ের হয়েছে, সেগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে।
এ দিকে ভারতের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন অনুসারে কেউটে, চন্দ্রবোড়ার মতো বিষধর সাপ শিডিউল ১–এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এরা বাঘ–সিংহ–হাতির মতোই আইনি সুরক্ষার বর্ম পায়। কোথাও নির্দিষ্ট ভাবে শিডিউল ১ গোত্রের প্রাণীদের ছাড়তে হলে সেই এলাকাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই আইন বাধা হবে না বলেই বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি। তাঁদের যুক্তি, ভারতে মোট বাঘের ২৫%–এর বেশি বিচরণ করে সংরক্ষিত অরণ্যের বাইরে। তা ছাড়া বিষধর সাপ ও কুমিরের পছন্দের বিচরণ ক্ষেত্র জলাশয় ও জলাভূমি এলাকা। ফলে তাদের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র থেকে উৎখাতের প্রশ্নও নেই।
তবে ভারতের সীমান্ত রক্ষায় সাপ–কুমির ছাড়ার এই পরিকল্পনা মনে করাচ্ছে আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তকে। বেআইনি অভিবাসীদের জন্য তারা দক্ষিণ ফ্লরিডায় যে ডিটেনশন সেন্টারটি বানিয়েছে, সেটি গোটা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে ‘অ্যালিগেটর অ্যালকারাজ়’ নামে। কারণ ওই ডিটেনশন সেন্টারটি এমন এলাকায় তৈরি, যার আশপাশে কুমিরে ভরা জলাভূমি রয়েছে। সেখান থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালানো অসম্ভব। তাই সেন্টারটিকে তুলনা করা হয় মার্কিন মুলুকের সান ফ্রান্সিসকোয় সমুদ্র ঘেরা ছোট্ট দ্বীপ অ্যালাকারাজ়–এর সঙ্গে, যেখানে এককালে বিশাল কয়েদখানা ছিল।
ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তেও কি তবে ভবিষ্যতে তৈরি হবে ‘অ্যালিগেটর অ্যালকারাজ়’?