নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: ‘দেখা হলে চুলের মুঠি ধরে ঘোরাব। আগামী দিনে জেলে ঢোকাব, না হলে চুলের মুঠি ধরে পিটিয়ে মারব’— রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমোকে নিয়ে পানিহাটির বিজেপি প্রার্থী রত্না দেবনাথের এই বক্তব্যে তুমুল নিন্দার ঝড় উঠেছে। তৃণমূলের তরফে ডেরেক ও ব্রায়েন বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন। শুধু সাধারণ মানুষ ওই ভাইরাল ভিডিওতে নিন্দাজনক বক্তব্য পোস্ট করছেন এমনটা নয়, একসময়ে অভয়ার বিচারের দাবিতে রত্না দেবনাথের পাশে থাকা লোকজনও হতবাক। বিজেপির মধ্যেও প্রার্থীর এই বক্তব্যে আলোড়ন ছড়িয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজ্যের নেতারা যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমীহ করে কথা বলেন, সেখানে দলের মহিলা প্রার্থীর মুখের ভাষায় প্রমাদ গুনছেন গেরুয়া শিবিরের ভোট কৌশলিরা। এতে যে পানিহাটি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা বিলক্ষণ বুঝে আলোচনাও শুরু হয়েছে।
বিজেপির প্রার্থী হয়ে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছেন আরজিকরে খুন ও ধর্ষণের শিকার হওয়া ডাক্তারি পড়ুয়ার মা রত্না দেবনাথ। আন্দোলন পর্বে এই রত্নাদেবী সিবিআই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার দেখা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ায় তাঁদের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। বলেছিলেন, তৃণমূলকে বাঁচাতে আসরে নেমেছে বিজেপি। আবার সেই দলের হয়ে ভোট লড়তে চাওয়ার উদ্দেশ্য ও কারণ নিয়ে রাজ্য জুড়েই বিতর্কের ঝড় উঠেছে। একসময় এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবী, বামপন্থী নেতা ও সাধারণ মানুষ তাঁদের পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তীব্র কটাক্ষের শিকার রত্নাদেবী। তাতে অবশ্য ভ্রুক্ষেপহীন রত্নাদেবী ও তাঁর পরিবার। বিজেপির প্রার্থী হতে চাওয়ার দিন সাংবাদিক সম্মেলনে সিপিএমকে বেনজির আক্রমন করে অভয়ার মা বলেছিলেন, ‘মেয়ের ঘটনার আবেগকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছে বামেরা। ওঁরা আন্দোলনের নামে মানুষের আবেগ নিয়ে রাজনীতি করেছে। বিচার পাইয়ে দেওয়ার বদলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাতে আমরা বিচার না পাই। ভোট কাটাকাটির অংকে বামপন্থীরা তৃণমূলকে টিকিয়ে রেখেছে।’ পানিহাটির সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্তকে আক্রমণ করে বলেছিলেন, ‘ওরা আমার মেয়ের কথ বলে ভোট চাইছে। যেন মনে হচ্ছে, ওরাই মেয়ের বিচার দেবে, আমি কেউ না। তাই বিচার চেয়ে বিজেপির প্রার্থী হয়েছি।’
মুখ্যমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ পর্বে রত্না দেবনাথের ভাষা চয়নে খোদ বিজেপির কর্মী-সমর্থকরাও হতবাক। পানিহাটির এক বিজেপি নেতা বলেন, ‘প্রথমে সিপিএমকে অযাচিত আক্রমণ করে বহু মানুষের নৈতিক সমর্থন খুইয়েছি। মহিলা হয়ে একজন মুখ্যমন্ত্রীকে নোংরা ভাষায় এহেন আক্রমণ, কেউ ভাবতেও পারছি না। তৃণমূলের বিরুদ্ধে নীতিগত লড়াই চলছে, চলবে। তাই বলে মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে এই ভাষায় আক্রমণ, বিজেপির সংস্কৃতি নয়। ‘অভয়া নয়, তামান্নার বিচার চাই’—সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্তের নামে একটি ভুয়ো দেওয়াল লিখন তৈরি করে ভাইরাল করে দেওয়া হয়েছে। কলতারবাবু সোমবার বলেন, বিজেপির আইটি সেল এটা তৈরি করেছে। সেই ভুয়ো প্রচারের ফাঁদে পড়ে অভয়ার মা তথা কাকিমাও মিথ্যা কথা বলছেন। এটা সত্যিই পীড়াদায়ক। পানিহাটির বিজেপি নেতা কৌশিক চট্টোপাধ্যায় রত্নাদেবীর পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, প্রকাশ্য সভায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে নিয়মিত গালিগালাজ করছেন মুখ্যমন্ত্রী। অভয়ার বিচার না পাওয়ার ষড়যন্ত্রের নায়িকা তিনিই। তাই অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে থাকা রত্নাদেবী কিছু কথা বলেছেন। তা নিয়ে বিতর্ক অবান্তর। তৃণমূলের মুখপাত্র সম্রাট চক্রবর্তী বলেন, অভয়া আমাদের সবার বাড়ির মেয়ে। কিন্তু কাকিমা অভয়ার ‘মা’ হিসেবে রাজনীতির ময়দানে নেমে যা করছেন, তাতে লজ্জা ছাড়া আর কোনও শব্দ উচ্চারণ করতে কষ্ট হচ্ছে।