একা লড়াইয়ে নেমে সংগঠনের বেহাল দশাই দেখছে কংগ্রেস, এবার নিজের শক্তি পরখ, বলছেন দলের নেতারা
বর্তমান | ০৭ এপ্রিল ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মধ্য কলকাতায় বেলেঘাটা সার্কুলার ক্যানেল সংলগ্ল এক বস্তি, কলোনি অঞ্চলে প্রচারে বেরিয়েছিলেন এক কংগ্রেস প্রার্থী। সঙ্গে হাতেগোনা কয়েকজন। নাম ঘোষণা হওয়ার পর তিনি যখন ওয়ার্ডে খোঁজ নেন জানতে পারেন, কোনো অঞ্চলে রয়েছেন মাত্র দু’জন কর্মী, কোথাও জনা দশেক, কোথাও সংখ্যাটা শূন্য। এই পরিস্থিতিতে নিজেই কয়েকজন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে পতাকা তুলে প্রচার করে চলেছেন। আক্ষেপ করে বললেন, ‘কী আর করা যাবে বলুন! নিচুতলায় সংগঠন নেই, কর্মী কোথা থেকে জুটবে? এভাবেই প্রচার করতে হচ্ছে।’
কাঁকুড়গাছি, মানিকতলা, বেলেঘাটা শুধু নয়, গোটা কলকাতাতেই কার্যত কংগ্রেসের সংগঠন দূরবীণ দিয়ে খুঁজতে হয়। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে কিছু কর্মীর দেখা মেলে কিংবা স্থানীয় সক্রিয় কয়েকজন নেতার পিছনে থাকেন। কিন্তু তার বাইরে গোটাটাই মিথ! ভোটে ‘একা’ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে সংগঠনের বেহাল দশা প্রত্যক্ষ করছেন কংগ্রেস প্রার্থীরা। কোনো ওয়ার্ড, ব্লক কিংবা অঞ্চলে দলের সক্রিয় কর্মী প্রায় নেই বললেই চলে। থাকলেও হাতেগোনা। উত্তর কলকাতায় এতদিন পর্যন্ত কংগ্রেসের একমাত্র কাউন্সিলার ছিলেন সন্তোষ পাঠক। তিনিও শিবির বদল করে এবার বিজেপিতে। চৌরঙ্গী কেন্দ্রের প্রার্থী হয়েছেন। এর বাইরে বিক্ষিপ্তভাবে শিয়ালদহ, এন্টালি অঞ্চলে কংগ্রেসের কিছু সক্রিয় কর্মী রয়েছেন। আর শহরের দক্ষিণ তল্লাটে বহুকাল ধরেই কংগ্রেসের ‘একা কুম্ভ’ হয়ে নিজেদের সক্রিয়তায় দল টানছেন নিউ আলিপুরের বাসিন্দা আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় কিংবা ভবানীপুরের প্রদীপ প্রসাদ। রবীন্দ্র সরোবরের পরিবেশ কর্মীদের সঙ্গে থেকে নানা ধরনের আন্দোলন কিংবা কেন্দ্রীয় বিরোধিতায় বিভিন্ন ইস্যুতে রাসবিহারী বা হাজরা মোড়ে কংগ্রেসের বিক্ষোভ আয়োজনে এই দুই নেতা হাত-শিবিরের বড়ো ভরসা। তাঁদের সঙ্গে দলের বেশ কিছু কর্মী রয়েছেন। এবার রাসবিহারী কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন আশুতোষ অন্যদিকে ভবানীপুরে প্রদীপ প্রসাদ। দু’জনেই নিজের মতো করে লড়ছেন। সকাল থেকে বিকেল দফায় দফায় প্রচার চালাচ্ছেন আশুতোষ। কখনো মধ্যবিত্ত-নিম্ম মধ্যবিত্ত পাড়ায়, কখনো বস্তিতে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কারা? ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী কোথায়? প্রচারে বেরিয়ে সংগঠনের বেহাল দশা, সমাজে দলের অবস্থান সম্ভবত ভালোই টের পাচ্ছেন এই তরুণ নেতা। আশুতোষের কথায়, ‘এ তো অস্বীকার করার জায়গায় নেই যে আমাদের সংগঠনের অবস্থা ভালো নয়। আমাদের সারাবছর আরও কাজ করতে হবে। সারাবছর মানুষের পাশে থাকতে হবে। গোটা সংগঠনকে একদম নিচু স্তর পর্যন্ত আরও ঢেলে সাজার প্রয়োজন রয়েছে। জেলা থেকে ওয়ার্ড স্তরে সারাবছর সাংগঠনিক কাজকর্ম করার প্রয়োজন। সারাবছরের জন্য ডেডিকেটেড কর্মী দরকার। কর্মী একদম নেই বলব না। তবে বেশিরভাগ জায়গাতেই নেই।’
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের যুক্তি ছিল, একা লড়ে দলের অবস্থা দেখা জরুরি। ২০১৬ সাল থেকে টানা বামেদের সঙ্গে গিয়ে কংগ্রেসের নিজের শক্তি পরীক্ষা হয়নি। তাই দলের আসল অবস্থা কি, কোথায় কত ভোট, তা জানতেই এবার একলা চলো রে সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সংগঠন যে একদম তলানিতে তা ময়দানে নেমে টের পাচ্ছেন কং প্রার্থীরা। বালিগঞ্জ কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী সোমেন মিত্রের পুত্র রোহন মিত্র। তিনিও দলের হাল সম্পর্কে সচেতন হলেও আশাবাদী। রোহনের কথায়, সংগঠনে আমরা বহু যোজন পিছিয়ে। তবে আমাদের তো হারানোর কিছু নেই। এবার যতটুকু হবে, ততটুকুই প্রাপ্তি। একদিকে দুর্নীতি অন্যদিকে নীতি-নৈতিকতার লড়াই। এবারের ভোটে আমরা বুঝতে পারব পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের অবস্থা ঠিক কোথায়? কারা আমাদের সঙ্গে রয়েছে, কোথায় কত কর্মী, এটা তো একা না বেরলে দেখাই যেত না।