• শুভেন্দুর সঙ্গী শাহ-প্রধান, দিলীপের জুটল রেখা গুপ্ত!
    আজকাল | ০৭ এপ্রিল ২০২৬
  • বিভাস ভট্টাচার্য

    দু'দিকে দুই দৃশ্য। একদিকে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অন্যদিকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত। অবশ্যই একদিনে নয়। দু'দিন আগে পরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী, দু'জনেই এসেছিলেন দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নের মিছিলে অংশগ্রহণ করতে। রাজ্যের দুই প্রান্তে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছিলেন কলকাতায়, ভবানীপুরে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কেন্দ্রে তাঁরা 'বাজি' শুভেন্দু অধিকারীর সমর্থনে। সেইসঙ্গে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা যখন নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন তখন সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। অন্যদিকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এসেছিলেন খড়গপুরে। রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি এবং ওই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষের সমর্থনে। যেখানে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন শুভেন্দুও। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি সাধারণ বলে মনে হলেও রাজনৈতিক মহলের মতে বিষয়টি খুব একটা হালকা বিষয় নয়। 

    রাজ্য রাজনীতিতে শুভেন্দুর উত্থান বাম আমলে। নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জির খুব কাছের সঙ্গী ছিলেন শুভেন্দু। ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে প্রবেশ। গণ আন্দোলনের অতীত। যে সময়টা তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন সেই সময়টা সাংসদ ছাড়াও রাজ্যে মন্ত্রী হিসেবে সামলেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে ভোটের লড়াইয়ে হারিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জিকে। যদিও এই জয় নিয়েও বিতর্ক আছে। তৃণমূল একাধিকবার অভিযোগ করেছে গণনা কেন্দ্রের মধ্যে 'লোডশেডিং' করিয়ে নিজের অনুকূলে ফল টেনে নিয়েছিলেন তিনি। 

    বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর সেই দলেও শুভেন্দু যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারেই আছেন। সোজা বাংলায় যদি বলা হয় তাহলে একথা বলতেই হবে রাজ্য রাজনীতিতে শুভেন্দু সবসময়ই একটি আলোচিত চরিত্র। অন্যদিকে আরএসএস থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া দিলীপ দলের রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব যেমন সামলেছেন তেমনি সামলেছেন সাংসদ ও বিধায়কের দায়িত্বও‌। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দিলীপের  সভাপতিত্বে এরাজ্যে বিজেপি যত আসন পেয়েছে তার রেকর্ড আগের কোনও সভাপতির নেই। সেইসঙ্গে নানা সময় দিলীপের বিতর্কিত মন্তব্যের যে 'রেকর্ড' আছে সেটাও কিন্তু অন্য কোনও সভাপতির নেই।

    মাঝে কিছুটা 'কোণঠাসা' হয়ে গেলেও শমীক ভট্টাচার্য রাজ্যে দলের সভাপতি হওয়ার পর ফের দিলীপ রাজ্য রাজনীতিতে আবার স্বমহিমায়। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী। কিন্তু সকাল যদি দিনের সূচনা করে তাহলে এই ধারণা মাথায় আসতেই পারে শুভেন্দুর মনোনয়নের মিছিল যেভাবে গুরুত্ব পেল সেভাবে কি গুরুত্ব পেল দিলীপের মিছিল? যা ফের রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি করেছে কৌতুহল। 

    তবে এর সঙ্গে আরেকটা বড় বিষয় জড়িয়ে আছে—দিল্লির নিয়ন্ত্রণ। অমিত শাহ যেভাবে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন, তাতে বোঝা যাচ্ছে প্রার্থী নির্বাচন হোক বা প্রচারের কৌশল—সবেতেই কেন্দ্রের ভূমিকা বাড়ছে। অর্থাৎ, মুখটা লোকাল হলেও, কন্ট্রোলটা থাকছে দিল্লির হাতেই।

    গত ২ এপ্রিল ভবানীপুরে শুভেন্দুর মনোনয়নের সভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দেন তাঁর কথাতেই শুভেন্দু এই কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন‌। সেইসঙ্গে তাঁর মনোভাবে এটাও স্পষ্ট হয়ে যায় এই লড়াইয়ে তিনি পুরোপুরিভাবে শুভেন্দুর সঙ্গে আছেন। ভোটে কী হবে না হবে সেটা পরের প্রশ্ন। কিন্তু 'শাহী'  মনোভাবে এটা স্পষ্ট রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপি শিবিরে দ্রুত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে শুভেন্দুর। 

    আর এই গুরুত্ব বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে শুভেন্দুর ভূমিকা। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে যত বিজেপি নেতা আছেন তাঁদের মধ্যে 'ক্রাউড পুলার' কিন্তু একমাত্র শুভেন্দু‌। রাজ্যের জেলায় জেলায় বিজেপির অন্দরে তাঁর অনুগামীর সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। রাজ্যে সরকার বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে শুভেন্দু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সরকার বিরোধী যে কোনো আন্দোলনে জনগণ দেখতে চায় একজন 'ব্যক্তি'কে। এই মুহূর্তে রাজ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলে শুভেন্দুর মতো ওজনদার ব্যক্তি বলতে গেলে সেভাবে নেই। এর পাশাপাশি আরও একটি বড় বিষয় হল এই নির্বাচনে যদি বিজেপি সেভাবে ভালো ফল করতে না পারে তাহলে তাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও পাঁচ বছর। মাঝের এই সময়টাতে কিন্তু কর্মীদের আন্দোলনমুখী করে রাখতে হবে। সেই হিসেবে কিন্তু শুভেন্দুর ভূমিকা অবশ্যম্ভাবী। হতে পারে সেটাও অমিত শাহ ভেবেই এভাবে দলের মধ্যে শুভেন্দুর গুরুত্ব বৃদ্ধি করছেন। যদিও 'দিল্লি এখনও অনেক দূর'‌।

    সব মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার—রাজ্য বিজেপিতে নেতৃত্বের ভারসাম্য বদলাচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর গুরুত্ব বাড়ছে, আর সেই বাড়বাড়ন্তে দিল্লির স্পষ্ট সমর্থন রয়েছে। দিলীপ ঘোষ এখনও আছেন, কিন্তু কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি আর আগের মতো নেই। এখন দেখার, এই নতুন সমীকরণ ভোটে কতটা কাজ করে, আর নির্বাচনের পরে এই ছবিটা একই থাকে, নাকি আবার বদলে যায়।
  • Link to this news (আজকাল)