পৃথক রাজ্য কি BJP করে দেবে? শিবির বদলে বংশীবদন যা বলছেন...
আজ তক | ০৭ এপ্রিল ২০২৬
রাজনীতির ময়দানে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু হয় না, আপ্তবাক্যটি ফের সত্যি প্রমাণ করলেন বংশীবদন বর্মন। দীর্ঘদিনের সখ্য কাটিয়ে শেষমেশ তৃণমূলের হাত ছাড়লেন গ্রেটার কোচবিহার পিপলস পার্টির এই দাপুটে নেতা। গন্তব্য, গেরুয়া শিবির। ‘উন্নয়ন’-এর তত্ত্বে ভর করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘ পথ হাঁটার পর, ঠিক বিধানসভা নির্বাচনের মুখে তাঁর এই ভোলবদল উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
বংশীবদনের এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। তাঁর দাবি, কোচবিহারের পৃথক অস্তিত্ব এবং রাজবংশী ভাষার স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে তৃণমূল নেত্রী ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। ‘আজতক বাংলা’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বংশীবদন সাফ জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে কোচবিহারের মূল দাবিগুলো রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত নয়, বরং কেন্দ্রের আওতাধীন। রাজ্য তার ক্ষমতার মধ্যে যতটুকু করার ছিল, তা করে ফেলেছে। এই যুক্তিতে চিঁড়ে ভেজেনি রাজবংশী নেতার। তিনি বরং বিজেপির আশ্বাসে অনেক বেশি ভরসা রাখছেন।
বংশীবদনের সাফ কথা, তৃণমূল দিয়ে তাঁদের আর লাভ হবে না। আজতক বাংলাকে তিনি জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে কোচবিহারের দাবিদাওয়াগুলি মূলত কেন্দ্রের এক্তিয়ারভুক্ত। রাজবংশী ভাষাকে সার্বিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক বা পৃথক রাজ্যের দাবি,রাজ্য সরকারের সেখানে করার কিছু নেই। এই ‘সীমাবদ্ধতা’র কথা শোনার পরেই তৃণমূলের প্রতি মোহভঙ্গ হয় তাঁর।
অথচ এক সময় ছবিটা ছিল অন্যরকম। ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর খাঘড়াবাড়ির সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর দীর্ঘ কারাবাস কাটাতে হয়েছিল বংশীবদনকে। জেল থেকে ফেরার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন দেন। রাজবংশী ভাষা অ্যাকাডেমি থেকে উন্নয়ন পর্ষদ, সব জায়গাতেই বংশীবদনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এমনকি ২০২৪-এর লোকসভা ভোটেও তিনি তৃণমূলের পক্ষেই সওয়াল করেছিলেন।
বংশীবদনের দাবি ছিল ২৫টি আসন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজেপির দেওয়া ২টি আসনেই আপাতত সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তী সময়ে কোচবিহারের দাবি নিয়ে কোনও সদর্থক মনোভাব দেখাননি। উল্টোদিকে, বিজেপি তাঁদের সমস্ত দাবিদাওয়া খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়ায় তিনি গেরুয়া শিবিরের দিকে ঝুঁকেছেন।
কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। বিজেপি যেখানে বরাবরই বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে, সেখানে দাঁড়িয়ে পৃথক রাজ্যের দাবি বা ১৯৪৯ সালের ভারতভুক্তি চুক্তির রূপায়ন কি আদেও সম্ভব? বংশীবদনের দাবি, বিধানসভা ভোটের পর বিজেপি এই নিয়ে পদক্ষেপ করবে। যদিও আলিপুরদুয়ার-কোচবিহারের বিজেপি নেতা মনোজ টিগ্গার কথায় অন্য সুর। তাঁর সাফ কথা, আপাতত লক্ষ্য বাংলা জয়, দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা হবে পরে।
বংশীবদনের আন্দোলনের শিকড় অবশ্য অনেক গভীরে। ১৯৪৯ সালের চুক্তি অনুযায়ী কোচবিহার যে একটি ‘সি’ ক্যাটাগরির রাজ্য ছিল, সেই বঞ্চনার ইতিহাসকেই বারবার সামনে আনেন তিনি। রাজবংশী সমাজের আত্মসম্মান ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইকে এবার তিনি দিল্লির আঙিনায় নিয়ে যেতে চান। ইতিহাস বলছে, ২০০৫ সালের আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছিলেন পুলিশকর্মী ও আন্দোলনকারীরা। সেই উত্তাল সময় পেরিয়ে রাজবংশী নেতা বুঝেছিলেন, কেবল রাজপথের লড়াইয়ে দাবি আদায় সম্ভব নয়। তাই কৌশল বদলে তিনি উন্নয়নের পথে হেঁটেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ‘উন্নয়ন’ বনাম ‘অধিকার’-এর লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত অধিকার আদায়কেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি।
তৃণমূল জমানায় রাজবংশী ব্যাটেলিয়ন বা পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পদক্ষেপগুলো বংশীবদনের সমর্থনকে সংহত করেছিল। এর ফলে কোচবিহারের রাজবংশী ও মতুয়া ভোটে তৃণমূলের প্রভাবও বেড়েছিল নজরকাড়াভাবে। এখন বংশীবদন শিবির বদলানোয় সেই ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরে কি না, সেটাই দেখার।
আপাতত উত্তরবঙ্গের রাজনীতির দাবার বোড়ে এখন বিজেপির হাতে। কোচবিহার-আলিপুরদুয়ার থেকে দুই দিনাজপুর, এমনকী জলপাইগুড়ি ও মালদায় গ্রেটার সংগঠনের প্রভাব রয়েছে। এখন বংশীবদনের সমর্থনে পদ্ম শিবির কি পারবে কোচবিহারের দুর্গ অটুট রাখতে, নাকি বাংলা ভাগের বিতর্ক ফের তাঁদের বিড়ম্বনায় ফেলবে। তার উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে।