নিতাই রক্ষিত
রোদে তেতে পুড়ে এসে হাঁড়িয়ার (Haria Drink) বাটিতে চুমুক দিয়েই মিলছে স্বস্তি। কেউ আবার কোনও মতে দু’ বাটি হাঁড়িয়া ‘টেনে’-ই দৌড় দিচ্ছেন ভোটের মিছিলে হাঁটতে। জঙ্গলমহলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এত চড়া রোদে ভোটের প্রচারে যাওয়ার আগে কিংবা ভোটের প্রচার সেরে এসে চুমুক দিচ্ছেন হাঁড়িয়ার বাটিতে। এক বাটির দাম ১০ টাকা। চানা মশলা, ঘুগনি, কলমিশাক ভাজা, চুনো মাছ ভাজা ইত্যাদি চাখনার দাম আলাদা। সেগুলোও ১০-১৫ টাকায় পাওয়া যায়। দু’ বাটি হাঁড়িয়া আর চাখনা মিলিয়ে ৩০ টাকার মধ্যেই মিলছে ভরপুর তৃপ্তি। তবে সবটাই হচ্ছে লুকিয়ে। আদিবাসীদের এই ট্রাডিশন্যাল ড্রিঙ্ক গরম পড়তেই দেখা যায় জঙ্গলমহলে। অনেকে বলেন, এর পুষ্টিগুণও রয়েছে। তবে, তা নেশার বস্তু হিসেবেই মূলত পান করা হয়।
পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহল এলাকায় রাস্তার ধারে, জঙ্গলের পাশে হাঁড়িয়ার পসরা নিয়ে বসেন মহিলারা। গরমের জঙ্গলমহলে এ ছবি একেবারেই চেনা। খেজুরপাতা, তালপাতা, বাঁশ, ত্রিপল ইত্যাদি দিয়ে অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরি করে চলে হাঁড়িয়ার কারবার। জঙ্গলের ছায়াঘেরা পরিবেশে হাঁড়িয়া ভাটিতে যুবকদের আনাগোনা, দলবেঁধে হাঁড়িয়া খাওয়া জঙ্গলমহলের অত্যন্ত চেনা চিত্র। সকাল থেকে বিকেল, রমরমিয়ে চলে বেচাকেনা। ভোটের বাজারে সেই বিক্রি বেড়েছে আরও।
ভাত পচিয়ে তৈরি করা এক বিশেষ পানীয় এই হাঁড়িয়া। ভাত পচিয়ে তৈরি হয় তা। পরিষ্কার কাপড়ের টুকরোতে জল দিয়ে সেই পচা ভাব চেলে যে নির্যাস বের হয়, সেটাই হাঁড়িয়া। যাঁরা হাড়িয়া খেয়েছেন, তাঁদের বক্তব্য, কোথাও কোথাও হাঁড়িয়াতে অ্যালকোহল মেশানো হয় বাড়তি নেশা হওয়ার জন্য। স্বাদে টক এই হাঁড়িয়া খেলে শরীর যেমন ঠান্ডা থাকে, তেমনই দীর্ঘক্ষণ পেট ভর্তি থাকে। খিদেও পায় না। যে হেতু ভাত পচিয়ে হাঁড়িয়া তৈরি হয়, এই পানীয়তে থাকে কার্বোহাইড্রেট। তাতে ক্লান্তি দূর হয়। রয়েছে, গ্লুকোজ, প্রোটিনও।
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের উত্তাপ ক্রমশই বাড়ছে জঙ্গলমহল জুড়ে। সকাল থেকেই প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় ভোটের প্রচার শুরু করছেন। দিনভর চলছে প্রচার। গরমে, রোদে ঘেমেনেয়ে প্রার্থীর সঙ্গে প্রচারে পা মেলাচ্ছেন কর্মীরাও। ক্লান্তি কাটাতে কেউ কেউ গলায় ঢালছেন হাঁড়িয়া।
শালবনির পিঁড়াকাটা সংলগ্ন রাস্তার পাশে জঙ্গলে আয়েস করে হাঁড়িয়া খাচ্ছিলেন বেশ কয়েকজন যুবক। কয়েকজনের মাথায় রাজনৈতিক দলের টুপি, হাতে ভাঁজ করা দলের পতাকা। তাঁরা অবশ্য হাঁড়িয়ার স্বাদের সঙ্গে অভ্যস্ত। জানালেন, দিনভর খাটুনি চলছে। ক্লান্তি কাটাতে হাড়িয়ার দোসর হয় না। অনেকক্ষণ পেটও ভরা থাকে।
জঙ্গলমহলের কিছু মহিলা এই হাঁড়িয়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বাড়ির পুরুষরা তাঁদের সহযোগিতা করেন। এক বিক্রেতা বলেন, ‘ভোটের প্রচার হচ্ছে বলে হাঁড়িয়া বিক্রিও হচ্ছে বেশি। সাধারণ দিনে ১০-১২ কেজি চালের হাঁড়িয়া বিক্রি হয়। এই কয়েকদিন ভোটের জন্য দুপুরের আগেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। যা দেখছি তাতে আরও বেশি করে হাঁড়িয়া আনতে হবে।’
পশ্চিমবঙ্গই শুধু নয়, পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, ছত্তিসগড়-সহ ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় আদিবাসীদের মধ্যে চল রয়েছে হাঁড়িয়া খাওয়ার।