এই সময়: শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদাররা দাবি করেছিলেন বাংলায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) হলে অন্তত এক কোটি ভোটারের নাম বাদ যাবে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন, নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) কাজে লাগিয়ে বাংলার ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের নাম কাটছে বিজেপি। প্রায় ছ’মাসের ‘সার’ পর্ব শেষে ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের নথির নিষ্পত্তির পরে বাংলার ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেল প্রায় ৯১ লক্ষ নাম, শতাংশের হিসেবে যা প্রায় ১১.৮৫। এর মধ্যে শেষ দফায় ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের নথির নিষ্পত্তির পরে বাদ গেল প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম। এ বারের ভোটে ‘সার’ই যেমন শাসক–বিরোধীর মূল ইস্যু, তেমনই এই বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যাটাই ভোটের ফলে কী ভাবে প্রভাব ফেলবে, সে দিকে তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।গত ৪ নভেম্বর বাংলায় ‘সার’ শুরুর আগে বাংলায় ভোটার তালিকায় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। মঙ্গলবার সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৭৭ লক্ষের মতো। প্রথমে খসড়া তালিকা, তারপরে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা এবং সোমবার রাতে সাপ্লিমেন্টারি ও ডিলিটেড লিস্ট মিলিয়ে তিন দফায় ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে। চূড়ান্ত ভোটার লিস্ট প্রকাশিত হওয়ার পরে যে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটার ‘বিচারাধীন’ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ৩২ লক্ষ ৬৮ হাজার ভোটারের নাম সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে উঠেছে। বাদ পড়েছেন প্রায় ২৭ লক্ষ, অঙ্কের বিচারে ৪৫ শতাংশের মতো।
নির্বাচন কমিশনের নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, এই তিন পর্ব মিলিয়ে সংখ্যার নিরিখে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছেন উত্তর ২৪ পরগনা জেলায়, প্রায় ১২ লক্ষ ৬০ হাজার। এরপরেই রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, নদিয়া ও মালদা। উত্তর কলকাতায় সব মিলিয়ে বাদ পড়েছেন প্রায় ৪ লক্ষ ৪৭ হাজার ভোটার এবং দক্ষিণ কলকাতায় ২ লক্ষ ৪৯ হাজার। ঘটনাচক্রে নদিয়া বাদে ২০২১–এর বিধানসভা ভোটের নিরিখে এই জেলাগুলিতে মূলত সে ভাবে দাঁতই ফোটাতে পারেনি বিজেপি।
উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা মিলিয়ে মোট বিধানসভা কেন্দ্রের সংখ্যা ৬৪। সেখানে ২০২১–এ বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৫টি আসন, তৃণমূলের দখলে এসেছিল ৫৮টি। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় একটি আসন পেয়েছিল নওশাদ সিদ্দিকির আইএসএফ। কলকাতার ১১টি ও হাওড়ার ১৬টি আসনের মধ্যে বিজেপি একটিও আসন পায়নি। মুর্শিদাবাদে ২২–এর মধ্যে মাত্র ২, মালদায় ১২টির মধ্যে ৪ ও উত্তর দিনাজপুরে ৯টির মধ্যে মাত্র ২টি সিট পদ্মের দখলে এসেছিল। এই জেলাগুলিতে ৪৩টি আসনের মধ্যে ৩৫টি পেয়েছিল তৃণমূল। নদিয়ায় অবশ্য ১৭টি সিটের মধ্যে পদ্ম ৯টি ও জোড়াফুল ৮টি আসনে জয়লাভ করে। কাকতালীয় হলেও যে জেলাগুলিতে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গিয়েছে, সেখানে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কই সবচেয়ে বেশি মজবুত। এই জেলাগুলিতে যে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ গেল, তা কী ভাবে প্রভাব ফেলবে, সে নিয়ে সংশয় রয়েছে রাজনৈতিক মহলের মধ্যে।
বিজেপি বরাবরই অভিযোগ করে এসেছে, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা–সহ লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীর নাম এই ‘সার’ প্রক্রিয়ায় বাদ গিয়েছে। এ দিনই অসমের কাছাড় জেলায় আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলায় অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি দাবি করেন, দেশের ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়ার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং তা ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল গান্ধীকে কটাক্ষ করে শাহ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নাম কেটে দিচ্ছে। এতে মমতা দিদি এবং রাহুল বাবার পেটে ব্যথা হচ্ছে।’ রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, ‘কোনও বাংলাদেশি, অনুপ্রবেশকারী ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় থাকবে না। ঝাড়াইবাছাই তো কমিশন করবেই। যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা ট্রাইব্যুনালে যেতে পারবেন, সেটা সুপ্রিম কোর্টই বলেছে।’
আর রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল বরাবরই অভিযোগ করে এসেছে, কমিশনকে দিয়ে বিজেপি বেছে বেছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের নাম বাদ দিয়েছে। ভোটার তালিকায় যে প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে, তার সম্প্রদায় ভিত্তিক কোনও পরিসংখ্যান কমিশন প্রকাশ করেনি। তবে দুই ২৪ পরগনা, মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরের বড় অংশ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় সেখানে বেশি নাম বাদ গিয়েছে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক কর্তারা। সেখানে বিপুল সংখ্যায় সংখ্যালঘু নাম বাদ পড়েছে বলে ধরেই নেওয়া যায়। তবে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ, গাইঘাটা, হাবরা বা নদিয়ার রাণাঘাটের মতো এলাকায় বিপুল সংখ্যায় মতুয়া ভোটারের নামও বাদ গিয়েছে বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের। এ দিন হাবরায় নির্বাচনী প্রচার থেকে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, ‘দেখে দেখে একটা কমিউনিটিকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। দেখে দেখে মতুয়া, রাজবংশী, সংখ্যালঘুদের বাদ দিচ্ছেন। উকুন বাছার মতো করে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। বাগদা, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় উকুন বাছার মতো করে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।’ তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধু সংখ্যালঘু মুসলিম নন, প্রচুর হিন্দু ভোটারের নামও বাদ গিয়েছে তালিকা থেকে। তাঁর কথায়, ‘যে ২৭ লক্ষ নাম আন্ডার অ্যাজুডিকেশনের নামে অবৈধ ভাবে কাটা হয়েছে, তার মধ্যে ১০ লক্ষের বেশি হিন্দু বাঙালির নাম রয়েছে। দলমত নির্বিশেষে আগামী দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবাইকে তাঁর মৌলিক অধিকার, ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেবেন। কেউ ভয় পাবেন না, আতঙ্কিত হবেন না।’ এখন দেখার, ৯১ লক্ষ বাদ পড়া ভোটারের এই অঙ্ক ৪ মে ভোটের ফলে কী প্রভাব ফেলে!