• ভোটবাক্সে বদলা নিন, ডাক মমতার
    এই সময় | ০৮ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: বাংলায় ভোটার লিস্ট থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়ার ‘বদলা’ ভোটের মাধ্যমে নেওয়ার ডাক দিলেন‍ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলনেত্রীর আহ্বান, উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়ার মতুয়া বলয় থেকে যে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা ২৯ এপ্রিল (দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন) ভোটের দিন যে‍ন ‘বদলা’ নেন।

    মঙ্গলবার নদিয়ার চাকদহ, উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ ও হাবড়ায় পরপর তিনটি জনসভা করেন মমতা। মতুয়া বলয়ের প্রাণকেন্দ্রেই রয়েছে এই তিনটি বিধানসভা। তিনটি সভা থেকেই মতুয়া সম্প্রদায়ের উদ্দেশে মমতার স্পষ্ট বার্তা, ‘মতুয়াদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে না। তা হলে আমার থেকে ভয়ঙ্কর কিছু হবে না। যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, ভোটের আগে (তাঁদের নাম) তোলার চেষ্টা করব। এই নাম কাটার বদলা নিতে হবে। এই অপমানের বদলা নিতে হবে। বিজেপির লোকেরাও বিজেপিকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। বাঁচার জন্য তৃণমূলকেই ভোট দিতে হবে।’

    চাকদহ ও বনগাঁর জনসভায় মতুয়া বলয়ের কোন কোন বিধানসভায় বেশি মানুষের নাম বাদ গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী তারও উদাহরণ দিয়েছেন। হরিণঘাটা, চাকদহ, গাইঘাটা, বনগাঁতে প্রচুর মতুয়া ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মমতার অভিযোগ। তাঁর দাবি, বনগাঁর মতুয়া বলয়েই ৯০ হাজার হিন্দুর নাম বাদ গিয়েছে এবং এর মধ্যে কোনও লজিক নেই। এই কারণে বনগাঁর সভায় মমতা বলেন, ‘একজনের নাম উঠেছে, তাঁর পাশের বাড়ির লোকের নাম ওঠেনি। একটি পরিবারে দু’জনের নাম উঠেছে, তিনজনের নাম বাদ দিয়েছে। যেন চৈত্র মাসের সেল চলছে!’

    ২০১৯–এলের লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই মতুয়া বলয় গেরুয়া শিবিরের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। এই গেরুয়া ঘাঁটিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়ায় মমতা বনগাঁর সভায় বলেন, ‘ওরা (বিজেপি) মতুয়া বিরোধী। নমঃশূদ্র বিরোধী। তফসিলি বিরোধী। আদিবাসী বিরোধী। ওদের ধর্ম হলো ভোট কাটা।’ গেরুয়া শিবির মতুয়াদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ঠেকাতে না পারলেও তৃণমূল তাঁদের ভোটের অধিকার রক্ষা করতে সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে মাঠে নেমে লড়াই করছে বলে বোঝাতে চেয়েছেন মমতা। ‘সার’–এর জন্য রাজবংশী, মতুয়া–সহ বিভিন্ন অংশের মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে বলে সরব হয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা জলপাইগুড়ির সভায় বলেছেন, ‘বিজেপির জমানায় স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরে মানুষকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই ভোটাররা যদি অবৈধ হন, তা হলে তাঁদের ভোটে যাঁরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা অবৈধ।’ যদিও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর পাল্টা বক্তব্য, ‘যে নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে বড় অংশ মৃত বা অনুপস্থিত ভোটার। উনি (মমতা) চাইছেন, মৃত ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় রাখতে। উনি চেয়ারে রয়েছেন এই অবৈধ ভোটার, অনুপস্থিত ভোটারদের জন্য! এঁদের নাম বাদ পড়ায় উনি ভয় পেয়েছেন।’ মতুয়া বলয়ে বড় সংখ্যায় নাম বাদ যাওয়ার কোনও প্রভাব ভোটে পড়বে না বলে বিজেপি নেতাদের পর্যবেক্ষণ।

    মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়ির একাংশ স্রেফ রাজনীতি করেছেন বলেও এ দিন মমতা অভিযোগ তুলেছেন। নাম না–করে তিনি এক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীকে নিশানা করেছেন বলে তৃণমূল নেতাদের পর্যবেক্ষণ। মমতা বনগাঁর সভায় বলেন, ‘যাঁরা আজকে ঠাকুর পরিবারে বিভেদ করে ভাবছেন, ভোট কেটে রাজনীতি করবেন, তাঁদের আমি বলি, বেশি কথা বলো না। অনিল আম্বানির কেসে কার কার নাম আছে, সব আমরা জানি। বেশি কথা বললে মুখোশ খুলে দেবো। শুধু বিজেপি করো বলে তোমাদের ঘরে ইডি–সিবিআই আসে না। বেশি বাড়াবাড়ি করবে না।’ তৃণমূলনেত্রীর এই মন্তব্য নিয়ে অবশ্য বিজেপি কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। অনিল আম্বানির কেসে যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর নাম রয়েছে, তাঁর সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ হাতে রয়েছে বলেও দাবি করেছেন মমতা। তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘সব নথি আছে। কার থেকে টাকা নিয়েছে‍ন, কী করেছেন... একজন তো জেলে আছে, শুনেছি সে জেলে আপনাদের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছে।’

    ঠাকুরনগরের মতুয়া বাড়ির যে অংশ গেরুয়া শিবিরে রয়েছে, সেই অংশের অতীতে কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়েও এ দিন সরব হয়েছেন মমতা। তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘মতুয়া মা যখনই অসুস্থ হতেন, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক আমাকে খবর দিয়ে সেখানে নিয়ে যেত। হাসপাতালে ভর্তি করত। এখন তোমরা মতুয়া ঠাকুরবাড়ি নিয়ে রাজনীতি করছ! ও ভাইরা, সে দিন কোথায় ছিলেন? ঠাকুমাকে তো দেখতেন না। খোঁজ নিতেন না!’ শুধু মতুয়া সমাজ নয়, মাদার টেরেসার মিশনারি অব চ্যারিটির তিনশো জনের নামও বাদ পড়েছে বলে এ দিন অভিযোগ করেছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘সেখানকার তিনশো ভোট বাদ দিয়েছে। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের অনেক সাধুর ভোট বাদ পড়েছে। বেলুড় মঠের সাধুদের নাম বাদ গিয়েছে। অনেক বিচারপতির নাম বাদ গিয়েছে, কিন্তু লজ্জায় বলতে পারেননি। এখন তাঁরা নাম তুলেছেন কি না জানি না।’

  • Link to this news (এই সময়)