• লিস্টে নাম তুললেন না ৫৭ হাজার, কেন অনীহা! ধন্দে নির্বাচন কমিশনও
    এই সময় | ০৮ এপ্রিল ২০২৬
  • সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়

    উত্তর কলকাতার বাসিন্দা বছর পঞ্চান্নর এক ভোটার এ বার স্বেচ্ছায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) এনিউমারেশন ফর্ম ফিলআপ করেননি। কারণ? এর আগে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন মিলিয়ে অন্তত তিন বার ভোট দিতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, তাঁর ভোট পড়ে গিয়েছে। ২০০২–এর ‘সার’ তালিকায় তাঁর নাম থাকলেও এ বার সচেতন ভাবেই তিনি নাম তুলতে চাননি ভোটার তালিকায়।

    বাংলায় ‘সার’ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে— শেষমেশ ভোটার তালিকায় নাম না–উঠলে কী হবে? বে–নাগরিক হয়ে যেতে হবে না তো? সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে না তো? আর আড়াই সপ্তাহ বাদে বাংলায় প্রথম দফায় বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে সাপ্লিমেন্টারি লিস্টেও যাঁরা ঠাঁই পাননি, অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়ার জন্য তাঁরা লম্বা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা এবং সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট মিলিয়ে বাংলায় বাদ পড়েছে প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের নাম। অনেক জায়গায় আতঙ্কিত–উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। এই আতঙ্ক–উদ্বেগের মধ্যে কারা স্বেচ্ছায় এনিউমারেশন ফর্মই ফিলআপ করলেন না?

    হুগলির ব্যান্ডেলের বাসিন্দা, শহরের একটি নামী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মী কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই তালিকায় রয়েছেন। তাঁর বাবা–মা এনিউমারেশন ফর্ম ফিলআপ করে ভোটার লিস্টে তুললেও কৃষ্ণেন্দু তোলেননি। কেন? তাঁর কথায়, ‘ভোটাধিকার আর নাগরিকত্ব এক জিনিস নয়। আমি যে এ দেশের নাগরিক, তার পর্যাপ্ত নথিপ্রমাণ আমার কাছে আছে। কিন্তু অতীতে দু’বার ভোট দিতে গিয়েও আমার ভোট পড়ে যাওয়ায় ফিরে আসতে হয়েছে। ফলে যে রাজ্যে সুষ্ঠু ভাবে একজন নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না, সেখানে ভোটের জন্য নাম তুলতে গিয়ে সময় ব্যয় করার অর্থ আছে বলে আমি মনে করি না।’

    নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, শুধু উত্তর কলকাতার ওই বাসিন্দা অথবা ব্যান্ডেলের কৃষ্ণেন্দু নন, রাজ্যে ৫০ হাজারের বেশি এমন ভোটার এমন রয়েছেন, যাঁরা সচেতন ভাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলেননি এ বার। অর্থাৎ, তাঁরা হয় এনিউমারেশন ফর্ম সংগ্রহ করেননি অথবা ফর্ম তুললেও তা ফিলআপ করে কমিশনের কাছে জমা দেননি। এই ভোটারদের নাম খসড়া তালিকা থেকেই বাদ গিয়েছিল। মৃত, স্থায়ী ভাবে স্থানান্তরিত, নিখোঁজ বা অনুপস্থিত এবং ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছিল। এর বাইরে বাদ গিয়েছেন আরও ৫৭,৬০৪ জন, যাঁদের ‘অন্যান্য’ তালিকায় ফেলা হয়েছে। কমিশন সূত্রের দাবি, এই ভোটারদেরই বড় অংশ হয় সচেতন ভাবে ফর্ম তোলেননি, অথবা তুললেও জমা দেননি।

    কমিশনের তথ্য বলছে, এই ধরনের ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো বিধানসভা কেন্দ্রে। সংখ্যাটা ২,৯৪২। এরপরেই রয়েছে শ্যামপুকুর, কাশীপুর-বেলগাছিয়া, বেলেঘাটা, চৌরঙ্গি, বালিগঞ্জ, কলকাতা বন্দর, উত্তর হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্র। কী কারণে তাঁরা ভোটার তালিকায় নাম তুলতে আগ্রহী নন, তা নিয়ে কোনও সমীক্ষা কমিশনের তরফে হয়নি। তবে মনে করা হচ্ছে, এঁদের অনেকেই হয় আগে ভোটার লিস্টে নাম থাকা সত্ত্বেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি অথবা কেউ শাসক–বিরোধী সব রাজনৈতিক দলের প্রতিই বীতশ্রদ্ধ। এরই প্রতিবাদ জানাতে এ বার ‘সার’-এ এনিউমারেশন ফর্ম পূরণ না করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁরা।

    কিন্তু এঁদের কি বে–নাগরিক হয়ে যাওয়ার ভয় নেই? কমিশনের কর্তারা বারবারই বলেছেন, ভোটাধিকার না–থাকার অর্থ বেনাগরিক হয়ে যাওয়া নয়। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, ভারতীয় নাগরিক ছাড়া কারও এ দেশে ভোটাধিকার থাকবে না। এর সঙ্গে নাগরিকত্ব আইনের সম্পর্ক নেই। বর্তমান নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী ভোটার না হলেও ভারতীয় নাগরিক হিসেবে থাকা যায়। আবার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, এই ভোটাররা কেন স্বেচ্ছায় ফর্ম তুললেন না বা তুললেও জমা দিলেন না, তা জানতে নির্দিষ্ট সমীক্ষার প্রয়োজন। কারণ, যদি তাঁরা নির্বাচনে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের উপরে আস্থা রাখতে না–পারেন, তা হলে তো ‘নোটা’য় ভোট দিতে পারেন। যেমন, ২০২১–এর ভোটে গোটা রাজ্যে ৬ লক্ষ ৪৭ হাজার ৭৮৩ জন ভোটার ‘নোটা’য় ভোট দিয়েছিলেন। তাঁদের সঙ্গে যাঁরা নাম ভোটার লিস্টে সচেতন ভাবে তুললেন না, তাঁদের ফারাক আছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে ২০০২-এ রাজ্যে শেষ ‘সার’ হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) বলে কোনও সংস্থান নেই। রয়েছে ইনটেনসিভ রিভিশন। এটা করার সময়ে কারও নাম বাদ পড়লে দায়িত্ব বর্তায় সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসারের (বিএলও) উপরে। সংবিধানে নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টকে কিছু বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া আছে।

    সেই বিশেষ ক্ষমতাবলে এ বার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন হচ্ছে। এনিউমারেশন ফর্মের উল্লেখ আইন বা বিধিতে উল্লেখ নেই। তাই একে স্ট্যাটিউটরি বা আইনসিদ্ধ ফর্ম বলা যাবে না। যেটা কমিশনের ৬,৭,৮ নম্বর ফর্মগুলিকে বলা যায়।’ তাঁর সংযোজন, ‘কেউ সেই ফর্ম না–তুললে বা তোলার পরেও তা জমা না দিলে এটা তাঁর স্বাধীনতার মধ্য পড়ে। ভোটার তালিকায় নাম না তুলেও কেউ প্রচলিত পদ্ধতির প্রতিবাদ জানাতে পারেন।’ রাজ্যের আর এক প্রাক্তন সিইও দেবাশিস সেনের কথায়, ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের সঙ্গে নাগরিকত্ব আইনের কোনও সংযোগ নেই। তাই ভোটার তালিকায় নাম না তুললে তাঁর নাগরিকত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এই যুক্তি ধোপে টেকে না। ভোটার তালিকায় নাম না তোলাটা নাগরিকের মৌলিক কর্তব্যের মধ্যেও পড়ে না। তারপরেও ভোটদান ও পছন্দমতো জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করাটা নাগরিকের অধিকারের মধ্যে পড়ে। সেটার জন্যই কমিশন ভোটার তালিকায় নাম তুলতে উৎসাহিত করে।’

  • Link to this news (এই সময়)