আশিস নন্দী, বনগাঁ
কমিশনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগেই মতুয়াদের ভরসা দিতে বনগাঁয় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মাস দুয়েকের ব্যবধানে নির্বাচনী সভা করতে মঙ্গলবার ফের বনগাঁয় এলেন তিনি। মতুয়া অধ্যুষিত এই বিধানসভা এলাকায় কয়েক লক্ষ মতুয়ার নাম বাদ গিয়েছে। তাঁদের মনে চেপে বসেছে বেনাগরিক হওয়ার আতঙ্ক। সেটা বুঝেই এ দিন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই নির্বাচনে আপনাদের লাইনে দাঁড় করানোর বদলা নিতে হবে। এ বারের ভোট মতুয়াদের অধিকার রক্ষার, ঠিকানার লড়াই, আপনাদের সন্তান সন্ততির ভবিষ্যতের লড়াই।’ পাশাপাশি তাঁর আশ্বাস, ‘তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর আপনারা নিশ্চিত থাকুন, আমরা কিছুতেই এখানে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেব না।’ তাঁর এই অভয় বাণীতে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন সভায় আসা মানুষজন, বিশেষ করে মহিলারা।
মঙ্গলবার বনগাঁর চার কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থীর সমর্থনে নির্বাচনী সভায় এসেছিলেন মমতা। বনগাঁ স্টেডিয়ামে সভার পাশেই তৈরি হয়েছিল অস্থায়ী হেলিপ্যাড। মুখ্যমন্ত্রী আসার আগেই অবশ্য সভামঞ্চের সামনের আসন ভরে গিয়েছিল। সেখানে মহিলাদের উপস্থিতি ছিল বেশি।বার্ধক্য ভাতা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসেছিলেন মহিলারা। সঙ্গে ছিল নীল–সাদা বেলুন। সভা শুরুর আগেই মঞ্চে বাজছিল ‘যতই কর হামলা, আবার জিতবে বাংলা’।
সেই গানের তালে মহিলাদের নাচতেও দেখা যায়। হেলিপ্যাডের বাঁশের ব্যারিকেডের বাইরেও ছিলেন প্রচুর মানুষ। মতুয়ারাও ডঙ্কা, কাঁসি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। হেলিকপ্টার থেকে নামার পর মমতাকে স্বাগত জানান মতুয়ারা। মুখ্যমন্ত্রী সভামঞ্চে উঠতেই হাততালি, উলুধ্বনি দেন মহিলারা। বক্তব্যে প্রয়াত বড়মার প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। পাশাপাশি প্রয়াত বিধায়ক ভূপেন শেঠের নাম করে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের কথাও বলেন মমতা। বলেন, ‘বনগাঁয় এলেই ভূপেনদার কথা খুব মনে পড়ে।ওঁর বাড়িতেও গিয়েছি।’ তৃণমূলের সময়কালে বনগাঁর উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বনগাঁর জন্য আলাদা পুলিশ জেলা, বনগাঁ হাসপাতালকে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে উন্নীত করা, আর্সেনিক মুক্ত পানীয় জল, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, ঠাকুরনগরের ফুলবাজারের কাজ হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে বিজেপি মিথ্যে প্রচার করছে। ওরা নির্বাচনের সময় ক্যাশ দেবে। কিন্তু ভোট শেষ হয়ে গেলে বুলডোজ়ার চলবে।’ তিনি মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘দুয়ারে সরকারের মতো এ বার দুয়ারে স্বাস্থ্য করব। প্রতিটি ব্লক, অঞ্চলে এই শিবির হবে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরেই মহিলারা হাততালি দিয়ে ওঠেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার নিরিখে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা প্রথম সারিতে রয়েছে। প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা থেকে বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে নাম বাদ গিয়েছে ৮৫ হাজার ৮৪৯ জন। বাগদা থেকে বাদ গিয়েছে ৫৮৯০ জন। বনগাঁ উত্তর থেকে বাদ গিয়েছে ৮৬ জন। বনগাঁ দক্ষিণ থেকে ৩১১ জন। আর গাইঘাটা থেকে বাদ গিয়েছে ১৬ হাজার ২২২ জন ভোটারের নাম।জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাদ গিয়েছে মতুয়া অধ্যুষিত গাইঘাটা কেন্দ্র থেকেই।
আতঙ্কিত মতুয়াদের ভরসা দিয়ে মমতা বলেন, ‘ভয় পাবেন না। ভোট দিতে গেলে যদি কেন্দ্রীয় বাহিনী আটকায়, তা হলে খিলের ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে করতে ভোট দিয়ে আসবেন।’ সভায় আসা মতুয়া দলপতি প্রদীপ রায় বলেন, ‘দিদি এখন আমাদের একমাত্র ভরসা। মতুয়াদের জন্য দিদি ছাড়া তো কেউ কিছু করেনি। ভোটাধিকার হারিয়ে এখন দিদির ভরসাতেই আছি।’ বাগদার তৃণমূল প্রার্থী মধুপর্ণা ঠাকুর বলেন, ‘যারা যে রাজনৈতিক দল করুক না কেন, নাম তো বেশি বাদ গিয়েছে মতুয়াদেরই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মতুয়াদের ভরসা দিলেন। আমরাও দিদির উপরেই ভরসা করে আছি।’